০২:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬

হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর চায় বাংলাদেশ, বড় বাধা ভারত:

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৪:২০:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
  • ৫৫২

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে ঢাকা। তবে এই রায় কার্যকরের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভারত, যেখানে শেখ হাসিনা বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় গত শনিবার (২২ নভেম্বর, ২০২৫)।
* রায়: মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের একটি আদালত অনুপস্থিতিতেই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এই অপরাধগুলো ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত হয়েছিল।
* পালিয়ে ভারতে আশ্রয়: ১৫ বছরের ক্রমবর্ধমান স্বৈরশাসনের পর গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের রাজধানীতে আশ্রয় নেন।
* বাংলাদেশের দাবি: বাংলাদেশ তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বারবার দাবি জানাচ্ছে।
* বাধা: তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে, যদি ভারত তাকে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত প্রত্যর্পণে রাজি না হওয়ায় তিনি দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছেন।
রাজনৈতিক যাত্রার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
* বাবার হত্যাকাণ্ড: শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার জীবন পথ পাল্টে দেয় ১৯৭৫ সালের আগস্টের এক রক্তাক্ত রাত, যখন সামরিক অভ্যুত্থানে তার বাবা, মা ও তিন ভাই নিহত হন। সেই সময় তিনি ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান।
* ভারতে নির্বাসন: পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ছয় বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান, যা ভবিষ্যৎ জীবনে ভারতের প্রতি তার আস্থাকে দৃঢ় করে।
* ক্ষমতায় ফেরা ও ‘দুই বেগমের লড়াই’: ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী তিন দশকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যান, যা ‘দুই বেগমের লড়াই’ নামে পরিচিত। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন।
* ২০০৮-এর পর শাসন: ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর তাকে আরও দৃঢ় এবং স্থায়ীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার সংকল্পে দেখা যায়। পরবর্তী ১৫ বছর তিনি কঠোর হাতে দেশ শাসন করেন। এই সময়ে ‘দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন, মিডিয়া ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন বাড়ার অভিযোগ ওঠে। তিনি ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা দিয়েছিলেন।
* ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন: বহু আন্দোলন টলাতে না পারলেও গত বছরের সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে বিক্ষোভে রূপ নেয় এবং কঠোর দমন-পীড়নের (জাতিসংঘের হিসাব মতে ১৪০০ নিহত) পরেও তা না থামায় শেষ পর্যন্ত তার সরকারের পতন ঘটে।
ত্যুদণ্ডের রায় ও ভারত-বাংলাদেশের অবস্থান
* অভিযোগ: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতেই বিচার করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে উসকানি, ফাঁসির আদেশ এবং ড্রোন, অস্ত্র, হেলিকপ্টার দিয়ে আন্দোলনে দমন-পীড়নের নির্দেশের মতো অভিযোগ ছিল।
* জনতার প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণার পর আদালতকক্ষে কান্না ও করতালিতে ভরে ওঠে। নিহত এক আন্দোলনকারীর বাবা রায়ে কিছুটা শান্তি পাওয়ার কথা জানান।
* ভারতের অবস্থান: ভারত এই রায়কে স্বীকৃতি দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে।
* প্রত্যর্পণে বাধা: ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত বলেন, ভারত তাকে ফেরত পাঠাবে কিনা তাতে তিনি খুবই সন্দিহান। ভারত ও বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ‘রাজনৈতিক অপরাধে’ কাউকে ফেরত না পাঠানো যায়। ভারত সম্ভবত এই যুক্তিই ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া, হাসিনা এখনো সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন, এমনকি হেগেও যেতে পারেন। তাই ভারত তাড়াহুড়ো করবে না।
* বাংলাদেশের চিঠি: রায়ের পরদিন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনাকে দ্রুত ফিরিয়ে দিতে ভারতের কাছে আবারও চিঠি দিয়েছে, যেখানে বলা হয়, “হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়া ভারতের দায়িত্ব।”
পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ
আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে হাসিনার এই মৃত্যুদণ্ড দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ, এবং নেতৃত্বেরও ঠিক-ঠিকানা নেই। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এখন গভীর রাজনৈতিক বিভাজন দূর করার কঠিন কাজে নেমেছে।
এখন প্রশ্ন হলো— হাসিনার পতন কি বিষাক্ত যুগের সমাপ্তি, নাকি নতুন অনিশ্চয়তার শুরু?

সর্বাধিক পঠিত

ঝিকরগাছায় ১৬ দিন ধরে নিখোঁজ কিশোর রাকিব, সন্তানের অপেক্ষায় মায়ের বুকভরা আর্তনাদ

হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর চায় বাংলাদেশ, বড় বাধা ভারত:

আপডেট: ০৪:২০:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে ঢাকা। তবে এই রায় কার্যকরের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভারত, যেখানে শেখ হাসিনা বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় গত শনিবার (২২ নভেম্বর, ২০২৫)।
* রায়: মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশের একটি আদালত অনুপস্থিতিতেই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এই অপরাধগুলো ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত হয়েছিল।
* পালিয়ে ভারতে আশ্রয়: ১৫ বছরের ক্রমবর্ধমান স্বৈরশাসনের পর গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের রাজধানীতে আশ্রয় নেন।
* বাংলাদেশের দাবি: বাংলাদেশ তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বারবার দাবি জানাচ্ছে।
* বাধা: তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে, যদি ভারত তাকে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত প্রত্যর্পণে রাজি না হওয়ায় তিনি দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছেন।
রাজনৈতিক যাত্রার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
* বাবার হত্যাকাণ্ড: শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার জীবন পথ পাল্টে দেয় ১৯৭৫ সালের আগস্টের এক রক্তাক্ত রাত, যখন সামরিক অভ্যুত্থানে তার বাবা, মা ও তিন ভাই নিহত হন। সেই সময় তিনি ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান।
* ভারতে নির্বাসন: পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ছয় বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান, যা ভবিষ্যৎ জীবনে ভারতের প্রতি তার আস্থাকে দৃঢ় করে।
* ক্ষমতায় ফেরা ও ‘দুই বেগমের লড়াই’: ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী তিন দশকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যান, যা ‘দুই বেগমের লড়াই’ নামে পরিচিত। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন।
* ২০০৮-এর পর শাসন: ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর তাকে আরও দৃঢ় এবং স্থায়ীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার সংকল্পে দেখা যায়। পরবর্তী ১৫ বছর তিনি কঠোর হাতে দেশ শাসন করেন। এই সময়ে ‘দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন, মিডিয়া ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন বাড়ার অভিযোগ ওঠে। তিনি ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা দিয়েছিলেন।
* ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন: বহু আন্দোলন টলাতে না পারলেও গত বছরের সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে বিক্ষোভে রূপ নেয় এবং কঠোর দমন-পীড়নের (জাতিসংঘের হিসাব মতে ১৪০০ নিহত) পরেও তা না থামায় শেষ পর্যন্ত তার সরকারের পতন ঘটে।
ত্যুদণ্ডের রায় ও ভারত-বাংলাদেশের অবস্থান
* অভিযোগ: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতেই বিচার করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে উসকানি, ফাঁসির আদেশ এবং ড্রোন, অস্ত্র, হেলিকপ্টার দিয়ে আন্দোলনে দমন-পীড়নের নির্দেশের মতো অভিযোগ ছিল।
* জনতার প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণার পর আদালতকক্ষে কান্না ও করতালিতে ভরে ওঠে। নিহত এক আন্দোলনকারীর বাবা রায়ে কিছুটা শান্তি পাওয়ার কথা জানান।
* ভারতের অবস্থান: ভারত এই রায়কে স্বীকৃতি দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে।
* প্রত্যর্পণে বাধা: ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত বলেন, ভারত তাকে ফেরত পাঠাবে কিনা তাতে তিনি খুবই সন্দিহান। ভারত ও বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ‘রাজনৈতিক অপরাধে’ কাউকে ফেরত না পাঠানো যায়। ভারত সম্ভবত এই যুক্তিই ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া, হাসিনা এখনো সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন, এমনকি হেগেও যেতে পারেন। তাই ভারত তাড়াহুড়ো করবে না।
* বাংলাদেশের চিঠি: রায়ের পরদিন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনাকে দ্রুত ফিরিয়ে দিতে ভারতের কাছে আবারও চিঠি দিয়েছে, যেখানে বলা হয়, “হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়া ভারতের দায়িত্ব।”
পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ
আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে হাসিনার এই মৃত্যুদণ্ড দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ, এবং নেতৃত্বেরও ঠিক-ঠিকানা নেই। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এখন গভীর রাজনৈতিক বিভাজন দূর করার কঠিন কাজে নেমেছে।
এখন প্রশ্ন হলো— হাসিনার পতন কি বিষাক্ত যুগের সমাপ্তি, নাকি নতুন অনিশ্চয়তার শুরু?