পৌষের স্নিগ্ধ সকালে কুয়াশাভেজা রোদে তালপাতায় ‘অ, আ, ক, খ’ লিখে অক্ষর জীবনের শুভ সূচনা করল যশোরের দুই শতাধিক শিশু। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে শেকড়ের সন্ধান আর আদি সংস্কৃতির মেলবন্ধনে শনিবার (১০ জানুয়ারি) ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হলো উদীচী যশোরের ঐতিহ্যবাহী ‘হাতেখড়ি উৎসব’।
শনিবার সকাল থেকেই কলেজ মাঠে জড়ো হতে থাকে অভিভাবক ও শিশুরা। তাদের কলকাকলিতে পুরো মাঠ যেন একটি বড় শিশুমেলায় পরিণত হয়। উদীচী যশোর পরিচালিত ‘অক্ষর শিশু শিক্ষালয়’-এর ১৯তম এই আয়োজনে অংশ নেয় আদিয়াত ফাইয়াজের মতো ছোট ছোট শিশুরা। দাদি আর মায়ের সঙ্গে আসা আদিয়াত আধো আধো কণ্ঠে তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, “আমি খুশি। পাতায় অ, আ লিখেছি। অনেক আনন্দ লাগছে।” এর আগে বাড়িতে স্লেটে লেখা শুরু করলেও, এমন উৎসবের আমেজে তালপাতায় কলম ধরার অভিজ্ঞতা ছিল তার কাছে একেবারেই নতুন।
জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর উদীচী শিশু শিল্পীদের মনোজ্ঞ সংগীত ও দলীয় নৃত্য পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পাভেল চৌধুরী। তিনি বলেন, “স্কুল জীবনে জ্ঞানার্জনের শুরুতে এমন সার্বজনীন আয়োজন শিশুদের মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত করবে। এটি একটি অনন্য উদ্যোগ।”
সমাজের বিভিন্ন স্তরের গুণী ও আলোকিত মানুষের হাত ধরে শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দান করা হয়। তালপাতায় শিশুদের বিদ্যা অর্জনের শুভ সূচনা করে দেন: বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম
যশোর কলেজের অধ্যক্ষ মুস্তাক হোসেন শিম্বা ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজের অধ্যক্ষ জেএম ইকবাল হোসেন সংবাদপত্র পরিষদ যশোরের সভাপতি একরাম উদ দ্দৌলা অক্ষর শিশু শিক্ষালয়ের অধ্যক্ষ শৈলেশ কুমার রায় সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক সাজেদ বকুল প্রমুখ।
যমজ সন্তান নিয়ে আসা ফারজানা বৃষ্টি নামে এক অভিভাবক বলেন, “যশোরে এমন ভিন্নধর্মী ও প্রশংসিত আয়োজন সচরাচর দেখা যায় না। তালপাতার এই হাতেখড়ি শিশুদের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছে। আমরা চাই এই ঐতিহ্যের ধারা অব্যাহত থাকুক।”
উদীচী যশোরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু জানান, গত ১৯ বছর ধরে তারা এই মঙ্গলাময় আয়োজন করে আসছেন। তিনি বলেন, “আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির যে ধারা ছিল—শিক্ষাগুরুদের মাধ্যমে হাতেখড়ি দিয়ে ছাত্রের মঙ্গল কামনা করা—উদীচী সেই আদি সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে পৌঁছে দিতে চায়। শিশুদের মানবিক ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”
সমাজের আলোকিত মানুষের হাত ধরে আগামীর এই শিশুরা সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবন গড়বে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন যশোরের সচেতন নাগরিক সমাজ।



























