যশোরের এক দম্পতি ইউরো ভিসা হেল্প সেন্টার বিডি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতারণায় লিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই দম্পতি হলেন যশোরের চোরমারা দীঘিরপাড় চাঁচড়ার মিজানুর রহমান মিন্টু (৫০) এবং তাঁর স্ত্রী বৃষ্টি বেগম। তাঁদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার নামে ভিসা প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণা করার অভিযোগ এনে একাধিক থানায় মামলা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই দম্পতি যশোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অনেক যুবকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। মোবাইল ফোন বন্ধ করে তাঁরা বর্তমানে নাটোর, খুলনা, ঢাকা-সহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে নতুন প্রতারণার ফাঁদ পাতছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ: ৪ যুবকের কাছ থেকে ৫৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ
প্রতারণার শিকার হওয়া চারজন যুবকের পক্ষে মোট ৫৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই দম্পতির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জমা পড়েছে।
থানায় দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন হলেন যশোর সদর উপজেলার সিরাজ সিংহা গ্রামের বাবলু রহমান (৫০)। তিনি অভিযোগ করেছেন যে ইউরো হেল্প সেন্টারের স্বত্বাধিকারী পরিচয় দেওয়া মিজানুর রহমান মিন্টু ও বৃষ্টি বেগম নিজেদের অফিস যশোর, খুলনা, ঢাকা ও নাটোর-সহ বিভিন্ন জেলায় আছে বলে প্রচার করতেন, তবে প্রধান অফিস নাটোরের বড়হরিশপুরে বলে জানানো হয়।
মিজানুর রহমানের বাড়ি যশোর এলাকায় হওয়ায় বাবলু রহমান তাঁর মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হন। বাবলু রহমানের অভিযোগ, এই দম্পতি চারজনকে কানাডায় চাকরির কথা বলে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন সময়ে মোট ৫৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর তাঁদের নাটোরের অফিসে বসে নগদ ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করা হয়।
টাকা নেওয়ার পরও কানাডায় না পাঠিয়ে নানা টালবাহানা শুরু করেন মিন্টু ও বৃষ্টি বেগম। শেষ কিস্তির ২০ লাখ টাকার মধ্যে মিজানুর রহমান ১৬ লাখ এবং তাঁর স্ত্রী বৃষ্টি বেগম ৪ লাখ টাকা নেন। বাবলু রহমান ছাড়াও এই প্রতারক চক্রের শিকার হয়েছেন:
* নাইমুল হক নাবিল (২৩), (বর্তমানে যশোর শহরের ভোলাট্যাংক রোড)
* নিশ্চিন্তপুরের রাসেল কবির
* মণিরামপুরের জামজামির মেহেদী হাসান (২২)
চেক প্রত্যাখ্যান ও ভুয়া কাগজপত্র দেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের কানাডায় বৈধ ভিসার মাধ্যমে ভালো বেতনে পাঠানোর জন্য প্রার্থীপ্রতি প্রথমে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। বিভিন্ন টালবাহানার পরে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান মিন্টু ভুক্তভোগী বাবলুর রহমানকে মেঘনা ব্যাংক লিমিটেডের একটি শাখার ২০ লাখ টাকার চেক (চেক নং-২২১৪৬০৮) দেন। তবে চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে অ্যাকাউন্টে টাকা শূন্য পাওয়া যায়।
এরপর গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে ভুক্তভোগীরা নাটোরের অফিসে গিয়ে দেখেন সেটি বন্ধ। ফোনে যোগাযোগ করা হলে মিন্টু জানান, টাকা দিতে সময় লাগবে এবং এই মুহূর্তে তিনি টাকা দিতে পারবেন না। এভাবে তাঁরা টাকা ফেরত না দিয়ে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ করে চলেছেন।
রাজা বরদাকান্ত রোড এলাকার শেখ হাসানুর রহমান (৪৮)-এর দেওয়া অন্য একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, মিজানুর রহমান ও কুমারী বৃষ্টি রানী ঘোষ ওরফে বৃষ্টি বেগম এখন বলারীপাড়া, নাটোরে বসবাস করছেন। তাঁর শ্যালক নাবিলকে কানাডায় পাঠানোর নামে জমি-জায়গা বিক্রি, ধার-দেনা ও সুদে টাকা নিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে মোট ২৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা পাওয়ার পরও শ্যালককে কানাডায় পাঠানো হয়নি। পাওনা টাকা চাইতে গেলে এই দম্পতির পক্ষ থেকে নানা হুমকির শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।
অভিযোগে আরও প্রকাশ, প্রার্থীদের কানাডায় না পাঠিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিসা দেওয়ার নামে ভুয়া বিএম ই টি কার্ড ও ভিসা দেওয়া হয়েছে। ওই দম্পতি টাকা আত্মসাৎ করে এখন আত্মগোপন করে আছেন।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি ও অভিযুক্তের মোবাইল বন্ধ
প্রতারণার শিকার নাবিলের বোন সাদিকা মুস্তারি জানিয়েছেন, তাঁর ভাইসহ অনেক প্রার্থীকে কানাডাতে না পাঠিয়ে মিন্টু ও বৃষ্টি বেগম বিভিন্ন অজুহাতে টালবাহনা করছেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নাটোর সদর থানার পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে গেলে তাঁদের পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে কথা বললে তাঁরা ২ দিনের মধ্যে টাকা-পয়সা মিটিয়ে দেবেন বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু তাঁরা সমস্যার সমাধান না করে উল্টো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন হুমকি প্রদর্শন করছেন।
সাদিকা মুস্তারি দাবি করেন, টাকা নেওয়ার সময় মিষ্টি কথা বললেও এখন পাওনা টাকা না দিয়ে খারাপ আচরণ ও হুমকি দিচ্ছেন। এই ঘটনার সাক্ষী হিসেবে তাঁর নিকটাত্মীয় অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের কাছে মোবাইলে রেকর্ডিং, মেসেজ ও ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ আছে। তিনি এই দম্পতিকে দ্রুত আটক এবং তাঁদের পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, এই অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৩৮ মিনিটে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান মিন্টুর মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
০৩:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
শিরোনাম:
ইউরো ভিসা হেল্প সেন্টারের নামে ৫৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ: যশোর দম্পতির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ
-
নিউজ ডেস্ক - আপডেট: ১০:১১:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- ৬০৪
সর্বাধিক পঠিত



























