১১:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস: দেবঘাটের বনে সারি সারি গণকবর

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১১:৩৬:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৬

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের বনাঞ্চল পরিণত হয়েছে পরিচয়হীন মরদেহের অস্থায়ী কবরস্থানে। বন্যার পানিতে ভেসে আসা ও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া যেসব মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো সেখানে দাফন করছে কর্তৃপক্ষ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। দুর্যোগকবলিত রসুয়া অঞ্চলের উপত্যকাগুলো থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ানের দেবঘাট বনাঞ্চলে এসব মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।

স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, কয়েক দিন আগেও দেবঘাটের বনপথ ছিল মানুষের হাঁটাচলার পরিচিত জায়গা। এখন সেখানে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী গণকবর। পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে অনেক মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে স্বাভাবিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিতওয়ানের ভারতপুরের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার গণেশ আর্যাল জানান, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এ কারণে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া মরদেহগুলো দ্রুত দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শনিবার দেবঘাটের বনাঞ্চলে ৯৬টি পরিচয়হীন মরদেহ দাফন করা হয়। রোববার আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে মরদেহ উদ্ধারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

মরদেহ শনাক্তের কাজে প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কাজ করছেন। তারা মরদেহের তথ্য নথিভুক্ত, ছবি সংরক্ষণ এবং স্বজনদের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছেন। প্রতিটি মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

পরবর্তীতে কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে যাতে তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পরিচয়হীন মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে নেপালি কর্তৃপক্ষ। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে দেহাবশেষ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

মরদেহ শনাক্তের কাজে নেপালের সঙ্গে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরাও সহযোগিতা করছেন। ভারত ইতিমধ্যে একটি ফরেনসিক দল পাঠিয়েছে। দলটি নেপালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে কাজ করবে। চীনের একটি দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে নেপাল।

এদিকে চিতওয়ানের ভারতপুর হাসপাতালের পরিস্থিতিও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের অস্থায়ী মর্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহ রাখা হলেও প্রায় ৫০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতার জায়গাটিতে প্রায় ১২৫টি মরদেহ রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহ পচে গেছে।

মরদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা পরিদর্শক অনিল থাপা জানান, উদ্ধার হওয়া মরদেহের অর্ধেকের বেশি এমন অবস্থায় রয়েছে, যেগুলোর মুখ দেখে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। মরদেহের দুর্গন্ধে হাসপাতাল ও আশপাশের পরিবেশও ভারী হয়ে উঠেছে।

নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে চিতওয়ান এক্সপো সেন্টারেও ভিড় করছেন শত শত মানুষ। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে স্বজনেরা সেখানে ছুটে আসছেন। অনেক পরিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এখনো তাদের নিখোঁজ স্বজনের কোনো সন্ধান পাননি।

মরদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণের জন্য আরেকটি পুরোনো ভবনকেও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে নেপাল রেড ক্রসের সহায়তা ডেস্ক ও পুলিশের নিবন্ধনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মরদেহ পচন ধীর করতে ড্রাই আইস, এয়ার কন্ডিশনার ও কুলিং ইউনিট ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক মরদেহ অস্থায়ী মর্গে আনা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের সঙ্গে যেমন বাড়ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠা, তেমনি বাড়ছে পরিচয় শনাক্তের চাপ।

গত বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী বিভিন্ন উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। দুর্যোগে শত শত মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।

সর্বাধিক পঠিত

নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস: দেবঘাটের বনে সারি সারি গণকবর

নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস: দেবঘাটের বনে সারি সারি গণকবর

আপডেট: ১১:৩৬:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের বনাঞ্চল পরিণত হয়েছে পরিচয়হীন মরদেহের অস্থায়ী কবরস্থানে। বন্যার পানিতে ভেসে আসা ও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া যেসব মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো সেখানে দাফন করছে কর্তৃপক্ষ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। দুর্যোগকবলিত রসুয়া অঞ্চলের উপত্যকাগুলো থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ানের দেবঘাট বনাঞ্চলে এসব মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।

স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, কয়েক দিন আগেও দেবঘাটের বনপথ ছিল মানুষের হাঁটাচলার পরিচিত জায়গা। এখন সেখানে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী গণকবর। পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে অনেক মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে স্বাভাবিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিতওয়ানের ভারতপুরের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার গণেশ আর্যাল জানান, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এ কারণে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া মরদেহগুলো দ্রুত দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শনিবার দেবঘাটের বনাঞ্চলে ৯৬টি পরিচয়হীন মরদেহ দাফন করা হয়। রোববার আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে মরদেহ উদ্ধারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

মরদেহ শনাক্তের কাজে প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কাজ করছেন। তারা মরদেহের তথ্য নথিভুক্ত, ছবি সংরক্ষণ এবং স্বজনদের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছেন। প্রতিটি মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

পরবর্তীতে কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে যাতে তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পরিচয়হীন মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে নেপালি কর্তৃপক্ষ। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে দেহাবশেষ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

মরদেহ শনাক্তের কাজে নেপালের সঙ্গে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরাও সহযোগিতা করছেন। ভারত ইতিমধ্যে একটি ফরেনসিক দল পাঠিয়েছে। দলটি নেপালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে কাজ করবে। চীনের একটি দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে নেপাল।

এদিকে চিতওয়ানের ভারতপুর হাসপাতালের পরিস্থিতিও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের অস্থায়ী মর্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহ রাখা হলেও প্রায় ৫০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতার জায়গাটিতে প্রায় ১২৫টি মরদেহ রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহ পচে গেছে।

মরদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা পরিদর্শক অনিল থাপা জানান, উদ্ধার হওয়া মরদেহের অর্ধেকের বেশি এমন অবস্থায় রয়েছে, যেগুলোর মুখ দেখে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। মরদেহের দুর্গন্ধে হাসপাতাল ও আশপাশের পরিবেশও ভারী হয়ে উঠেছে।

নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে চিতওয়ান এক্সপো সেন্টারেও ভিড় করছেন শত শত মানুষ। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে স্বজনেরা সেখানে ছুটে আসছেন। অনেক পরিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এখনো তাদের নিখোঁজ স্বজনের কোনো সন্ধান পাননি।

মরদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণের জন্য আরেকটি পুরোনো ভবনকেও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে নেপাল রেড ক্রসের সহায়তা ডেস্ক ও পুলিশের নিবন্ধনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মরদেহ পচন ধীর করতে ড্রাই আইস, এয়ার কন্ডিশনার ও কুলিং ইউনিট ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক মরদেহ অস্থায়ী মর্গে আনা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের সঙ্গে যেমন বাড়ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠা, তেমনি বাড়ছে পরিচয় শনাক্তের চাপ।

গত বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী বিভিন্ন উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। দুর্যোগে শত শত মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।