ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০১৮ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন ওয়াসেক বিল্লাহ। এমনকি তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আত্মীয় হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মন্নু হাজরার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের সূত্রপাত চট্টগ্রাম ভ্যাটের অধীন বান্দরবান সাব-ডিভিশনে দায়িত্ব পালনের সময় থেকে বলে জানা যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে সহযোগী মানিক দত্তকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে নিয়মবহির্ভূত অভিযান পরিচালনা, নথিপত্র তল্লাশি এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হতো। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে মামলা ও প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ঘটনায় ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল বান্দরবান হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দিয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
বান্দরবান থেকে পরবর্তীতে টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পাওয়ার পর ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। তৎকালীন সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি কৌশলগতভাবে টেকনাফে পদায়ন নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, টেকনাফে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ইয়াবা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কাঠের গুঁড়ি ও আচারের প্যাকেটের আড়ালে ইয়াবা পাচারে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে প্রায় ১০ মাস ধরে ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে এয়ারফ্রেইট ইউনিটের ‘ডেলিভারি গেট-১’ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। ওই গেট দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য খালাস হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, পণ্য খালাস ও কাস্টমসের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তিনি নিয়মিত ঘুষ আদায় করেন। প্রতিটি ফাইলে স্বাক্ষর ও কাজের অনুমোদনের জন্য ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া মিথ্যা ঘোষণা ও আমদানি শর্ত না মেনে উচ্চ শুল্কের পণ্যসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত পণ্য খালাসে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ভিউ ব্রিড বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও মহসিন হোসেনের দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, গত ছয় মাসে রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষের মাধ্যমে ওয়াসেক বিল্লাহ প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, যথাযথ ঘোষণা ও আমদানি শর্ত পূরণ ছাড়াই বিভিন্ন পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় বিশেষ সুবিধায় খালাস করে দেওয়ার কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এর ফলে একদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
ওয়াসেক বিল্লাহর কথিত অবৈধ সম্পদের একটি অংশ রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া মৌজায় রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ৩৬৪৯৭ নম্বর খতিয়ানে তার নামে ৩৩ শতাংশ জমি কেনার তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া উত্তরার ‘কিংফিশার বার’-এর মালিকানা নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি অন্য একজনের নামে পরিচালিত হয় বলে দাবি করা হয়েছে, অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এর প্রকৃত মালিকানার সঙ্গে ওয়াসেক বিল্লাহর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তবে এসব সম্পদ ও ব্যবসায়িক মালিকানার অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে একটি কথিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে পৃথক তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পরে খুদে বার্তার মাধ্যমে তাকে একাধিক প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।




















