১১:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

রংপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মুসার বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পদ ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:২১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৯

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, টেন্ডার বাণিজ্য এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ রাজধানীর অভিজাত এলাকায় রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ করেছেন তিনি।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার লালমাটিয়ার ‘ব্লক-এ’র ৬/৪ ও ৬/১১ নম্বর ঠিকানায় মমনেট বিল্ডিংয়ের লিফটের চতুর্থ তলায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ বর্গফুট আয়তনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন মো. মুসা। ফ্ল্যাটটির মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

সরকারি বেতন কাঠামোর একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এই মূল্যের ফ্ল্যাট কেনার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ফ্ল্যাটটি কেনার বিষয়ে মো. মুসা দাবি করেছেন, তিনি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে এটি কিনেছেন। কোন ব্যাংক থেকে এবং কার নামে ঋণ নিয়েছেন—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট রংপুর এলজিইডিতে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক সংস্কার, সেতু নির্মাণ ও সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। মো. মুসার বিরুদ্ধেও রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার কাজের বিপরীতে শতাংশ হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে ঠিকাদারদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

২০২৫ সালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হরিনাবাড়ী বাজার পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজের মান ও প্রকৌশলগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলেও প্রকল্প যাচাই কিংবা বিল স্থগিতের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং নিরীক্ষা ছাড়াই বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে মো. মুসার বিরুদ্ধে।

এদিকে, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আখতার হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে মো. মুসা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব ও পদায়নে প্রভাবশালী ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে তিনি তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর সহকারী প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সইএন) পদে পদোন্নতি পেয়ে রংপুরে যোগ দেন।

এছাড়া মিউনিসিপ্যাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সার্ভিসেস প্রজেক্ট (এমজিএসপি)-এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অর্থের অনিয়মের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। এসব কাজে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আলী আখতার হোসেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

আলী আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে পিরোজপুরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। ওই ঘটনায় বর্তমান রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর আমলে নিয়োগ, বদলি ও কমিশন বাণিজ্যেও মো. মুসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সাড়ে ৩ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মুসা বলেন, তিনি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। তবে ঋণের ব্যাংক, ঋণের পরিমাণ কিংবা ঋণগ্রহীতার বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।

তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক প্রশ্ন পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. মুসার বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বাধিক পঠিত

উত্তরায় ৫ হাজার ৩১০ ইয়াবাসহ পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

রংপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মুসার বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পদ ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ

আপডেট: ১০:২১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, টেন্ডার বাণিজ্য এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ রাজধানীর অভিজাত এলাকায় রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ করেছেন তিনি।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার লালমাটিয়ার ‘ব্লক-এ’র ৬/৪ ও ৬/১১ নম্বর ঠিকানায় মমনেট বিল্ডিংয়ের লিফটের চতুর্থ তলায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ বর্গফুট আয়তনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন মো. মুসা। ফ্ল্যাটটির মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

সরকারি বেতন কাঠামোর একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এই মূল্যের ফ্ল্যাট কেনার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ফ্ল্যাটটি কেনার বিষয়ে মো. মুসা দাবি করেছেন, তিনি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে এটি কিনেছেন। কোন ব্যাংক থেকে এবং কার নামে ঋণ নিয়েছেন—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট রংপুর এলজিইডিতে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক সংস্কার, সেতু নির্মাণ ও সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। মো. মুসার বিরুদ্ধেও রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার কাজের বিপরীতে শতাংশ হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে ঠিকাদারদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

২০২৫ সালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হরিনাবাড়ী বাজার পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজের মান ও প্রকৌশলগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলেও প্রকল্প যাচাই কিংবা বিল স্থগিতের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং নিরীক্ষা ছাড়াই বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে মো. মুসার বিরুদ্ধে।

এদিকে, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আখতার হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে মো. মুসা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব ও পদায়নে প্রভাবশালী ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে তিনি তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর সহকারী প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সইএন) পদে পদোন্নতি পেয়ে রংপুরে যোগ দেন।

এছাড়া মিউনিসিপ্যাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সার্ভিসেস প্রজেক্ট (এমজিএসপি)-এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অর্থের অনিয়মের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। এসব কাজে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আলী আখতার হোসেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

আলী আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে পিরোজপুরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। ওই ঘটনায় বর্তমান রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর আমলে নিয়োগ, বদলি ও কমিশন বাণিজ্যেও মো. মুসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সাড়ে ৩ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মুসা বলেন, তিনি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। তবে ঋণের ব্যাংক, ঋণের পরিমাণ কিংবা ঋণগ্রহীতার বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।

তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক প্রশ্ন পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. মুসার বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।