রাজধানীর মিরপুর-কালশীর আর্থ অ্যান্ড হ্যাভেন স্কুলের প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামান-এর বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, বেতন আটকে রাখা, নিয়োগপত্র দিতে বিলম্ব, চুক্তির শর্ত নিয়ে জটিলতা এবং চাকরি ছাড়ার সময় বেতন কেটে রাখাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক এসব অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের সময় যেসব শর্ত ও সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তার অনেকটাই বাস্তবায়ন করা হয়নি। চাকরি ছাড়তে গেলে নোটিশ পিরিয়ডের কথা বলে বেতন কেটে রাখা বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
সাবেক শিক্ষক কদর জামিলের অভিযোগ, চাকরি ছাড়ার জন্য তিনি এক মাসের নোটিশ দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগপত্র দেন এবং ২২ মার্চ পর্যন্ত কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে ৪ মার্চই চাকরি ছেড়ে দিতে বলে। ফলে এক মাসের পরিবর্তে মাত্র ১২ দিনের বেতন দেওয়া হয় এবং বাকি ১৮ দিনের বেতন পরিশোধ করা হয়নি বলে তার দাবি।
আরেক শিক্ষক সায়েমের অভিযোগ, ছয় মাসের প্রবেশন পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর চাকরির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। পরে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে দুই মাসের নোটিশ পিরিয়ডের কথা বলে তার বেতন থেকে প্রায় ১২-১৩ হাজার টাকা কেটে রাখা হয়।
শিক্ষক রায়হানের অভিযোগ, চাকরিতে যোগদানের তিন মাস পরও তাকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। প্রায় আট মাস পর নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও নিয়োগের সময় বেতন বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তার আরও অভিযোগ, শিক্ষকদের মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন ছিল। একপর্যায়ে তাকে চাকরি ছাড়ার জন্য এক মাসের সময় দেওয়া হয়। পরে আবার চাকরিতে রাখার আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রায় চার মাস পর কোনো লিখিত কারণ ছাড়াই তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলা হয়। চাকরি ছাড়ার সময় তার পাওনা বেতন থেকেও দুই হাজার টাকা কম দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
রায়হানের অভিযোগ, প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামানের আচরণ অনেক সময় শিক্ষকদের প্রতি রূঢ় ও অপেশাদার ছিল।
শিক্ষক সাদিক জানান, ৪ এপ্রিল ইন্টারভিউ দেওয়ার পর তাকে পরদিন স্কুলে যোগ দিতে বলা হয়। মৌখিকভাবে তাকে ১৮ হাজার টাকা বেতন এবং তিন মাসের প্রবেশন পিরিয়ডের কথা জানানো হয়েছিল। প্রবেশন শেষে বেতন ২০ হাজার টাকা হওয়ার কথাও বলা হয়।
তবে পরে যে অফার লেটার দেওয়া হয়, তাতে যোগদানের তারিখ, প্রবেশন পিরিয়ড ও নোটিশ পিরিয়ডসহ বিভিন্ন তথ্যে অসঙ্গতি ছিল বলে তার অভিযোগ। এ কারণে তিনি অফার লেটারে স্বাক্ষর করেননি।
সাদিকের অভিযোগ, বিষয়টি সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও সংশোধিত অফার লেটার দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি তাকে টিচার আইডি কার্ডও দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তার আরও অভিযোগ, চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানালে নোটিশ পিরিয়ডের কথা বলে তার ২২ দিনের বেতন থেকে ১৩ হাজার ২০০ টাকা কেটে রাখা হয়। তবে তার সঙ্গে এ ধরনের কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শিক্ষক অভিযোগ করেন, বিদেশে পড়াশোনার জন্য আবেদন করার বিষয়টি তিনি আগেই স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। ভিসা হলে পরবর্তী সেশনে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন না—এ বিষয়েও তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
তার দাবি, প্রথমে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি না থাকলেও পরে হঠাৎ তাকে আর স্কুলে না আসতে বলা হয়। প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামান তার বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন। তবে ওই শিক্ষিকার দাবি, চুক্তিতে চাকরির পাশাপাশি অন্য কোথাও আবেদন করার বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না এবং তিনি নোটিশ পিরিয়ডের বিষয়টিও আগে জানিয়েছিলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নোটিশ পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই তাকে চাকরি ছাড়তে বলা হয় এবং তার পাওনা বেতনের একটি অংশ দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চাইলে সেটি দিতেও অনীহা দেখানো হয় বলে তার দাবি।
ওই শিক্ষিকার আরও অভিযোগ, প্রিন্সিপাল তাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতেন এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও মন্তব্য করতেন। এ ছাড়া শিক্ষকদের দিয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে শ্রেণিকক্ষ সাজানো এবং প্রশাসনিক কাজ করানোর অভিযোগও করেন তিনি। এসব অতিরিক্ত কাজের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না বলেও দাবি করেন তিনি।
কয়েকজন সাবেক শিক্ষকের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার মান নিয়েও তাদের অসন্তোষ রয়েছে। ক্যামব্রিজ কারিকুলাম অনুসরণের কথা থাকলেও বাস্তবে সবসময় তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হতো না বলে অভিযোগ করেন তাদের কেউ কেউ।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আর্থ অ্যান্ড হ্যাভেন স্কুলের প্রিন্সিপাল সাইফুজ্জামান-এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ীই স্কুল পরিচালনা করা হচ্ছে এবং তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো মিথ্যা। একপর্যায়ে তিনি ফোনে বিস্তারিত কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ ও প্রিন্সিপালের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র, বেতন পরিশোধের নথি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নীতিমালা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




















