জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে দুটি অভিযোগে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আটটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর আড়াইটার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায় ঘোষণার সময় হাসানুল হক ইনু ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১টা ৪২ মিনিটে তাকে হাজতখানা থেকে এজলাসে আনা হয়। এরপর ২১১ পৃষ্ঠার রায়ের বিভিন্ন অংশ পাঠ করেন ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অভিযোগ পর্যালোচনা শেষে দুপুর আড়াইটার দিকে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান।
প্রসিকিউশনের আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল তিন নম্বর অভিযোগে ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। এছাড়া ছয় ও সাত নম্বর অভিযোগে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং পৃথকভাবে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে আদালত নির্দেশ দেন, সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হবে। ফলে তাকে মোট ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
অন্যদিকে, এক, দুই, চার, পাঁচ ও আট নম্বর অভিযোগে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হলে আদালত তা আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে একই বছরের ২ নভেম্বর আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। ৩০ নভেম্বর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পর ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দেন দুজন।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয় এবং ১৪ মে শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ৩০ জুন রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ততা এবং কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয় হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পরিকল্পনা, কারফিউ, বলপ্রয়োগ এবং কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা ছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে আদালত কিছু অভিযোগ প্রমাণিত এবং কিছু অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে রায়ে উল্লেখ করেন।
রায় ঘোষণার মাধ্যমে বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, রায়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ উভয় পক্ষের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।




















