ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা জোরদারের মুখে সৌদি আরবকে সহায়তার উপায় নিয়ে জরুরি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর আওতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে অন্য দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক, জ্বালানি ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে আসছে।
বৃহস্পতিবার হুতিরা সৌদির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের দাবি করে। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ইয়েমেন থেকে নিক্ষেপ করা অন্তত ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। হামলার আশঙ্কায় মক্কা, জেদ্দা ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ইয়ানবুসহ বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়।
এর আগে হুতিরা রিয়াদ ও ইয়ানবুর বিভিন্ন ‘সংবেদনশীল’ স্থাপনায় হামলার দাবিও করেছিল। সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার অংশ নেন।
বৈঠকে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে তিন দেশের সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে জরুরি বৈঠকের আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সৌদি আরবের মক্কা ও অন্যান্য বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানান এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান।
এর আগে তুরস্ক জানিয়েছিল, প্রয়োজন হলে সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতার কিছু ঘাটতি পূরণে কারিগরি ও প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। পাকিস্তানও চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় সময়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে, যদিও এর আগে ইসলামাবাদ বলেছিল, তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি।
এদিকে হুতিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের দায় সরাসরি ইরানের ওপর বর্তানোর বিষয়ে তেহরান দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি মার্কিন টেলিভিশন ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হুতিরা তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেরাই দায়ী। একই সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে তেহরানের আগ্রহের কথাও জানান।
তবে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। চলতি মাসে জি৭-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ইরানকে হুতিদের অস্ত্র ও সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব সৌদি আরবের নিরাপত্তার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপরও পড়ছে। বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। CBS News
এ অবস্থায় সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তিন দেশের সামরিক প্রধানদের আসন্ন বৈঠকে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সহায়তা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।




















