জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর সদ্য সাবেক কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দাকে মোংলা কাস্টমস হাউসের কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। তার নতুন পদায়নের মধ্যেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, জাল নথি তৈরি, রাজস্ব ফাঁকিতে সহযোগিতা এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ বন্ড-সংশ্লিষ্ট পদে দায়িত্ব পালন করার সুযোগে আবু ওবায়দা একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছিলেন। ওই বলয়ের মাধ্যমে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়মে সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ঢাকাকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ পদে
মিয়া মো. আবু ওবায়দা বিসিএস ২২তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ২০০৩ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে বন্ড কমিশনারেটে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
কর্মজীবনে আইসিডি কমলাপুর, এনবিআর সচিবালয়, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং বন্ড কমিশনারেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে তিনি বন্ড-সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
তার দীর্ঘদিন একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার পেছনে প্রশাসনিক প্রভাব বা রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজ করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীন ও দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো।
অভিযোগে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ‘ফরিদ’ নামের এক ব্যক্তি এবং জামান এক্সেসরিজের মালিক জামানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগে উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ, লেনদেনের ধরন এবং কার কাছে অর্থ পৌঁছাত—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কর্মকর্তা বদলিতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি অংশে চট্টগ্রাম ভ্যাট কার্যালয়ের কর্মকর্তা এ.বি.এম মাসুমকে বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে আবু ওবায়দার দপ্তরে নিয়ে আসার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাব কাজ করেছে।
তবে ওই কর্মকর্তার বদলি বা পদায়নসংক্রান্ত অফিস আদেশ ও প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা ছাড়া অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ফটোকপির দোকানে জাল ইউপি তৈরির অভিযোগ
আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি বন্ড কমিশনারেট ভবনের নিচতলায় থাকা একটি ফটোকপির দোকানকে ঘিরে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন ব্যবহার করে জাল ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) এবং বন্ড-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি তৈরি করা হতো।
এসব নথি ব্যবহার করে মাহমুদ গ্রুপ ও ডংবেং গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইমরান হাসানকে অফিসের বাইরে গিয়ে ওই দোকানে নথি সত্যায়নের কাজ করতে দেখা গেছে।
তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা যাচাইকৃত নথি জনসমক্ষে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ আবু ওবায়দাকে তার ধর্মীয় ভাবমূর্তি ও পোশাক-পরিচ্ছদের কারণে ‘বন্ড হুজুর’ নামে অভিহিত করেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এই ধর্মীয় ভাবমূর্তির আড়ালে তিনি বন্ড-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন।
তবে কারও ধর্মীয় পরিচয় বা পোশাককে কোনো অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নথি, আর্থিক তথ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রমাণ।
আবু ওবায়দাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংবাদ সরিয়ে নেওয়া বা প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধের জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বন্ড কমিশনারেটের কয়েকজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের ফোন করে প্রতিবেদন প্রকাশ না করা কিংবা প্রকাশিত সংবাদ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন।
এ ছাড়া কয়েকজন সাংবাদিককে অনৈতিক সুবিধার প্রস্তাব দেওয়া এবং বিষয়টি ‘সামাল দেওয়ার’ জন্য তাদের তদবিরে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এমন অভিযোগের মধ্যেই দাপ্তরিক আদেশে আবু ওবায়দাকে মোংলা কাস্টমস হাউসের কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
আদেশ অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ০৮.০১.০০০০.০০০.০১১.০৫.০০০১.২৪ স্মারকে তাকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তার এই পদায়নকে ঘিরে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঢাকাকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নতুন দায়িত্বে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
তবে পদায়নটি নিয়মবহির্ভূত হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আবু ওবায়দাকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সামগ্রিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামালের একটি অংশ নির্ধারিত উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ শুল্ক-কর থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আমদানি নথি, ইউটিলাইজেশন পারমিশন, কাঁচামালের হিসাব, উৎপাদন ও রপ্তানি তথ্য এবং রাজস্ব পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, আবু ওবায়দার দায়িত্ব পালনকালে বন্ড কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ইউপি ইস্যু, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সুবিধা, বন্ড লাইসেন্স, কাঁচামালের হিসাব এবং রাজস্ব আদায়ের তথ্য নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
একই সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পদায়ন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি, কথিত অর্থ লেনদেন এবং অভিযোগে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
এ ধরনের তদন্ত হলে অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নথিভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কাস্টমস কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তার বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার ব্যাখ্যা ও অবস্থান যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য ও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। এসব অভিযোগ কোনো আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই প্রয়োজন।















