রাজধানীর মুগদা থানা এলাকার মানিকনগর পুলিশ ফাঁড়িকে ঘিরে মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর, আটক ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নথিপত্র, মামলার রেকর্ড, জব্দ তালিকা, ভিডিও, কল রেকর্ড ও আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় বছর ধরে মানিকনগর ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা এসআই কাইম বাহাদুরের সময়ে এলাকায় মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন সময়ে মাদক ও জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।
স্থানীয় পর্যায়ে কথিত মাদক ব্যবসা ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগে মিল্লাত, শরিফ, দেলা, নিঝু, রিনা, লতা, তুষার, কয়লা এবং লতার মায়ের নাম উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, তুষার স্টুডিয়াম এলাকায়, কয়লা সবেদাতলা এলাকায়, লতার মা কুমিল্লা পট্টি এলাকায়, মিল্লাত মানিকনগর ডালে এলাকায়, দেলা চান্দা গলিতে, রিনা কমিশনার গলিতে, লতা বালুর মাঠ এলাকায় এবং নিঝু ওয়াসা রোড এলাকায় মাদক ব্যবসা বা সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে পূর্বের মামলা, জিডি, গ্রেপ্তার ও পুলিশের অভিযানসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
দেলা ও লতার কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ‘চিনি বাবু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে সাপ্তাহিক টাকা সংগ্রহ করা হয়।
তবে এই অর্থের পরিমাণ কত, কেন নেওয়া হয় এবং কার কাছে পৌঁছায়—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কথিত অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, কল রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা যেতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মানিকনগর প্রেম গলি, চান্দা গলি, কমিশনার গলি, বালুর মাঠ, ওয়াসা রোড, সবেদাতলা, কুমিল্লা পট্টি ও মানিকনগর বিশ্বরোড এলাকায় মাদক ও জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড চলে।
এ ছাড়া মান্ডা এলাকার বিভিন্ন মাদক ও জুয়ার স্পট থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশের টহল ও অভিযানের রেকর্ড, মামলা ও জিডির তথ্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়ভাবে ‘দাতভাঙা সিরাজ’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, ভোট চলাকালে তিনি ফাঁড়ির ইনচার্জকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে মেসেজ করেছিলেন। এ-সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ড সাংবাদিকদের হাতে রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই কল রেকর্ডটি আসল কি না, এতে কথা বলা ব্যক্তিরা কারা এবং কথোপকথনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
এ ছাড়া সাংবাদিকদের হাতে আসা একটি ভিডিওতে কথিত জুয়ার আসরের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে টাকা নেওয়ার দৃশ্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওটির ধারণের সময়, স্থান এবং দৃশ্যমান ব্যক্তিদের পরিচয় ফরেনসিক ও অন্যান্য উপায়ে যাচাই করা হলে অভিযোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ফাতেমাকে হিরনসহ আটকের ঘটনায় ৩০ হাজার টাকা, বিল্লালকে হিরনসহ আটকের ঘটনায় ২০ হাজার টাকা এবং লতার ভাইকে হিরনসহ আটকের ঘটনায় ১৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া একটি মোটরসাইকেল আটকের ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আটকের জিডি, মামলা, জব্দ তালিকা, আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য ও আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।
মানিকনগর ফাঁড়ির সরকারি মোটরসাইকেলের জ্বালানি ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি মোটরসাইকেল ব্যবহারের জন্য মাসে ৬০ লিটার অকটেন বরাদ্দ রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—বরাদ্দকৃত জ্বালানি পুরোপুরি ব্যবহার না হলে অব্যবহৃত জ্বালানির হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়?
এ বিষয়ে মোটরসাইকেলের লগবুক, জ্বালানি গ্রহণ রেজিস্টার, বিল-ভাউচার এবং মাসিক ব্যবহার বিবরণী পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
মানিকনগর বিশ্বরোডে একটি ভাঙারি দোকান ও পাম্পের পাশের এলাকা থেকে প্রায় ২৫ কেজি তামা আত্মসাতের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, আলামিন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে তাকে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো এবং মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। তাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির না হওয়ার জন্যও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। প্রকৃত ঘটনা জানতে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, কোনো জিডি বা মামলা হয়ে থাকলে তার নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
মানিকনগর এলাকায় একটি প্রাইভেটকার থেকে গাঁজা উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অভিযানে মোট ৫২ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হলেও থানার মালখানায় ৩২ কেজি জমা দেখানো হয়েছে। ফলে বাকি ২০ কেজি গাঁজার হিসাব কোথায়—এ প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এই দাবি সত্য কি না, তা নিশ্চিত করতে হলে পুলিশের জব্দ তালিকা, এজাহার, আলামত গ্রহণের রসিদ, মালখানা রেজিস্টার, আদালতে পাঠানো আলামতের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথি পর্যালোচনা করতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, বাকি গাঁজা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মানিকনগর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাইম বাহাদুরের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ে তার বক্তব্যের একটি রেকর্ড সাংবাদিকদের কাছে পাঠানোর পর সেটি মুছে দেওয়া হয়। পরে মুঠোফোনে তার বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানোর আশঙ্কার কথাও অভিযোগকারীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন। এ অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মানিকনগর ফাঁড়িকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে মতিঝিল জোনের ডিসি মো. হারুন অর রশিদের বক্তব্য জানতে চাইলে বিষয়টি বিভাগীয়ভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নথি যাচাইয়ে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য
মানিকনগর ফাঁড়িকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে ৫২ কেজি গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় ৩২ কেজি জমা দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে বাকি ২০ কেজির হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কথিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পূর্বের মামলা ও জিডি, গ্রেপ্তার ও অভিযানসংক্রান্ত নথি, জুয়ার আসরের ভিডিও, কল রেকর্ড, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং সরকারি মোটরসাইকেলের জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে মানিকনগর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাইম বাহাদুর, মুগদা থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত নয়; নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথি যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করা সম্ভব।












