১২:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১১:৩৯:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৬

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ-কমিশন বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সওজের এক ঠিকাদারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমে পাঠানো একটি লিখিত অভিযোগে এসব দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে তাকে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তিনি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তারেক ইকবাল দাবি করেছেন, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের মোমারিজপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহেরের ছেলে আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সওজ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন।

অভিযোগকারীর দাবি, কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও পদোন্নতি লাভ করেন। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চাকরির শুরুর দিকে তারেক ইকবাল আওয়ামীপন্থী প্রকৌশলী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীর এলাকায় চকরিয়া সড়ক উপবিভাগে তদবিরের মাধ্যমে পদায়ন নেন এবং নিজেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।

এরপর ২০০৬ সালে তদবিরের মাধ্যমে ঢাকা সড়ক বিভাগের কল্যাণপুর উপবিভাগে যোগদানের অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আশুলিয়া টোল আদায়ের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে এ-সংক্রান্ত সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারীর দাবি, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক ইকবাল নিজেকে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী থাকাকালে নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তারেক ইকবাল স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রীর স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদেরের কাছে উপহার-উপঢৌকন পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি নোয়াখালীর সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার দাবিও করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো নথি বা স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, তারেক ইকবাল পরবর্তীতে মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বরিশাল সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং সর্বশেষ কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি না পেলেও তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মস্থলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, ই-জিপি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও তিনি বিভিন্নভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের প্রভাব ব্যবহার করে ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের টেন্ডার নথি, ই-জিপি রেকর্ড, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারদের তালিকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুদিন তারেক ইকবাল নিয়মিত অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। পরে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে নিজেকে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং চট্টগ্রাম সড়ক জোনে পদায়নের চেষ্টা করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

তবে এসব দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

লিখিত অভিযোগে তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে চাকরির সুবাদে ঘুষ, কমিশন, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রকল্পের অর্থে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে রাজধানীতে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, দামি ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ১/১২ পার্ক ভিউ ভবনের এ/১ নম্বর ফ্ল্যাটটি তার মালিকানাধীন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। ফ্ল্যাটটির বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলেও অভিযোগকারীর দাবি।

এ ছাড়া রাজধানীতে আরও কয়েকটি প্লট বরাদ্দ নেওয়া এবং এসব সম্পদের একটি অংশ আয়কর নথিতে প্রদর্শন না করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, প্রকৃত সম্পদের মালিকানা আড়াল করতে তারেক ইকবালের স্ত্রী ফারজানা রহমান ভূঁইয়া, সন্তান ও বিভিন্ন আত্মীয়ের নামে সম্পদ কেনা হয়েছে।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তারেক ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যদের আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, নামজারি, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হুদার আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, তারেক ইকবালের দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন কর্মস্থলের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্পে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

একই সঙ্গে তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, রাজউকের নথি এবং ব্যবসায়িক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে ২০২৯ সালে অবসরে যাওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবালের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তার জবাবে তিনি বলেন, “আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”

এর বাইরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অতএব, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আর্থিক তথ্য, টেন্ডার রেকর্ড ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমেই এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব।

সর্বাধিক পঠিত

রেলওয়ে ডিজির পিএস নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ

সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট: ১১:৩৯:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ-কমিশন বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সওজের এক ঠিকাদারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমে পাঠানো একটি লিখিত অভিযোগে এসব দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে তাকে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তিনি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তারেক ইকবাল দাবি করেছেন, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের মোমারিজপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহেরের ছেলে আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সওজ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন।

অভিযোগকারীর দাবি, কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও পদোন্নতি লাভ করেন। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চাকরির শুরুর দিকে তারেক ইকবাল আওয়ামীপন্থী প্রকৌশলী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীর এলাকায় চকরিয়া সড়ক উপবিভাগে তদবিরের মাধ্যমে পদায়ন নেন এবং নিজেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।

এরপর ২০০৬ সালে তদবিরের মাধ্যমে ঢাকা সড়ক বিভাগের কল্যাণপুর উপবিভাগে যোগদানের অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আশুলিয়া টোল আদায়ের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে এ-সংক্রান্ত সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারীর দাবি, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক ইকবাল নিজেকে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী থাকাকালে নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তারেক ইকবাল স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রীর স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদেরের কাছে উপহার-উপঢৌকন পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি নোয়াখালীর সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার দাবিও করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো নথি বা স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, তারেক ইকবাল পরবর্তীতে মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বরিশাল সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং সর্বশেষ কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি না পেলেও তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মস্থলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, ই-জিপি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও তিনি বিভিন্নভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের প্রভাব ব্যবহার করে ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের টেন্ডার নথি, ই-জিপি রেকর্ড, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারদের তালিকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুদিন তারেক ইকবাল নিয়মিত অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। পরে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে নিজেকে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং চট্টগ্রাম সড়ক জোনে পদায়নের চেষ্টা করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

তবে এসব দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

লিখিত অভিযোগে তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে চাকরির সুবাদে ঘুষ, কমিশন, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রকল্পের অর্থে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে রাজধানীতে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, দামি ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ১/১২ পার্ক ভিউ ভবনের এ/১ নম্বর ফ্ল্যাটটি তার মালিকানাধীন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। ফ্ল্যাটটির বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলেও অভিযোগকারীর দাবি।

এ ছাড়া রাজধানীতে আরও কয়েকটি প্লট বরাদ্দ নেওয়া এবং এসব সম্পদের একটি অংশ আয়কর নথিতে প্রদর্শন না করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, প্রকৃত সম্পদের মালিকানা আড়াল করতে তারেক ইকবালের স্ত্রী ফারজানা রহমান ভূঁইয়া, সন্তান ও বিভিন্ন আত্মীয়ের নামে সম্পদ কেনা হয়েছে।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তারেক ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যদের আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, নামজারি, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হুদার আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, তারেক ইকবালের দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন কর্মস্থলের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্পে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

একই সঙ্গে তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, রাজউকের নথি এবং ব্যবসায়িক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে ২০২৯ সালে অবসরে যাওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবালের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তার জবাবে তিনি বলেন, “আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”

এর বাইরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অতএব, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আর্থিক তথ্য, টেন্ডার রেকর্ড ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমেই এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব।