১০:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কমলাপুর কাস্টমসে মঈনুল-সুমি ‘সিন্ডিকেটের’ দাপট, বদলি হচ্ছেন কর্মকর্তারা মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ; সাত চালানে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৭

ঢাকার কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন ও কাস্টমস কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমিকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেটের’ অভিযোগ উঠেছে। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা পণ্য খালাস, শুল্ক ফাঁকি, কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মঈনুল হোসেন ও খাদিজা পারভীন সুমি। কাস্টম হাউসের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন জানিয়েছেন, রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে তিনি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় এক দশক ধরে কমলাপুর কাস্টম হাউস আইসিডিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা পণ্য খালাসের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

কোনো কর্মকর্তা মঈনুলের চালান আটকে দিলে বা পণ্যের ঘোষণা নিয়ে আপত্তি তুললে তাঁকে আইসিডি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।

সূত্রের দাবি, মঈনুলের সঙ্গে সাবেক আনস্টাফিং কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় মঈনুলের আমদানি করা শিটের চালান যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, খাদিজা পারভীন সুমি প্রায় ১১ মাস আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় মঈনুলের প্রতিষ্ঠান পারভীন ট্রেডার্সের নামে প্রায় ৫১ হাজার টন শিটের চালান খালাস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার টন ছিল কম শুল্কের এইচআর শিট বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে।

মঈনুল দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মাধ্যমে কাজ করেন—পারভীন ট্রেডার্স ও মা অ্যাসোসিয়েট। অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে পারভীন ট্রেডার্সের মাধ্যমেই বেশি শিটের চালান খালাস করা হয়েছে।

প্রতি টন সিআর শিটে প্রায় ২৮ হাজার টাকা, এইচআর শিটে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা এবং জিপি শিটে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা শুল্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সুমি দায়িত্বে থাকার সময় মঈনুলের চালানগুলো তেমনভাবে খুলে পরীক্ষা করা হয়নি এবং মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি।

প্রায় দুই মাস আগে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়। সুমিকে সরিয়ে সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে দায়িত্ব দেওয়া হলে শিট আমদানির চালানগুলোতে যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয় বলে জানা গেছে।

এ সময় মঈনুলের পারভীন ট্রেডার্সের ২ হাজার ২৩৩ টন এইচআর ও সিআর শিট এবং ১০ হাজার ১৬২ টন জিপি শিট খালাসের তথ্য পাওয়া যায়।

এর মধ্যে সাতটি চালান মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে আটকে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রিগুলো হলো—সি-১১৫৫৫, সি-১১৫৪৮, সি-১১৫৫২, সি-১১৫৫৭, সি-১১৫৪৭, সি-১১৫৫৩ ও সি-১১৫৫৪।

এসব চালানে মিথ্যা ঘোষণার দায়ে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আটকে মামলা করার এক সপ্তাহের মধ্যেই আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মঈনুলের পক্ষে বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে ওই কর্মকর্তাকে সরানোর ক্ষেত্রে সাবেক আনস্টাফিং কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমি ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় ৪১ ব্যাচের কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে। মঈনুলের মা অ্যাসোসিয়েটের গাড়ির গ্রুপও তাঁর তত্ত্বাবধানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

শিটের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি থেকে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার তথ্যও রয়েছে।

চিঠির পর সঠিক ঘোষণা অনুযায়ী শিটের চালান খালাস শুরু হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে বলে অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একপর্যায়ে নতুন কমিশনার সঠিক যাচাই ছাড়া শিটের চালান খালাসে সম্মতি না দেওয়ায় প্রায় দেড় মাস পর এনবিআরের নির্দেশনায় সঠিক ঘোষণা দেওয়ার শর্তে চালান খালাস করা হয়।

সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় খালাস হওয়া চালানের প্রায় ৯০ শতাংশ কম শুল্কের শিট হিসেবে ঘোষণা করা হতো। পরবর্তী সময়ে চিত্রটি বদলে যায়। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ চালান বেশি শুল্কের শিট হিসেবে খালাস হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এর ফলে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ কমেছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

কমলাপুর কাস্টম হাউসে বদলি ও তথ্য গোপন করে পণ্য খালাসের অভিযোগ নতুন নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতে এক কমিশনার বদলি হওয়ার পরদিন সরকারি ছুটির দিনে মাত্র দুই ঘণ্টায় ৮২০ টন শিট মিথ্যা ঘোষণায় খালাস করা হয়েছিল। এ ঘটনায় পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মঈনুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া শিট-সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপের কারণে সিআইসির এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মঈনুল হোসেন তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তিনি কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি দেননি।

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলা অনেকের নামেই হয়। সুমি দায়িত্বে থাকার সময় কেন চালান পরীক্ষা করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে তাঁরা শুধু সিআর ও এইচআর শিট আমদানি করেছিলেন।

খাদিজা পারভীন সুমিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকাকালে কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি হয়নি। তিনি দায়িত্ব পালনকালে নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন এবং সাধারণত বিকেল ৫টার মধ্যেই অফিস ত্যাগ করতেন।

সন্ধ্যার পর তাঁর অধীনস্থ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলমের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমি বলেন, উপকমিশনার হিসেবে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের দায় তিনি নিতে পারেন না।

কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন বলেন, **“আমি কাস্টম হাউসে যোগ দেওয়ার পর থেকে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়মের চেষ্টা করেছে, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি।”**

তিনি আরও জানান, কাস্টম হাউসে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়ম মেনেই কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এনবিআরের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসির চিঠি, সাতটি চালান আটকে জরিমানা এবং অতীতের অনিয়মের অভিযোগ—সব মিলিয়ে কমলাপুর কাস্টম হাউসে শিট খালাস প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে মঈনুল হোসেন ও খাদিজা পারভীন সুমি উভয়েই তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, চালান, দায়িত্বকালীন সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সর্বাধিক পঠিত

শার্শায় বাওড় দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, শর্টগানের ছররা গুলিতে আহত ৫

কমলাপুর কাস্টমসে মঈনুল-সুমি ‘সিন্ডিকেটের’ দাপট, বদলি হচ্ছেন কর্মকর্তারা মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ; সাত চালানে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা

আপডেট: ১০:০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকার কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন ও কাস্টমস কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমিকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেটের’ অভিযোগ উঠেছে। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা পণ্য খালাস, শুল্ক ফাঁকি, কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মঈনুল হোসেন ও খাদিজা পারভীন সুমি। কাস্টম হাউসের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন জানিয়েছেন, রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে তিনি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় এক দশক ধরে কমলাপুর কাস্টম হাউস আইসিডিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা পণ্য খালাসের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

কোনো কর্মকর্তা মঈনুলের চালান আটকে দিলে বা পণ্যের ঘোষণা নিয়ে আপত্তি তুললে তাঁকে আইসিডি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।

সূত্রের দাবি, মঈনুলের সঙ্গে সাবেক আনস্টাফিং কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় মঈনুলের আমদানি করা শিটের চালান যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, খাদিজা পারভীন সুমি প্রায় ১১ মাস আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় মঈনুলের প্রতিষ্ঠান পারভীন ট্রেডার্সের নামে প্রায় ৫১ হাজার টন শিটের চালান খালাস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার টন ছিল কম শুল্কের এইচআর শিট বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে।

মঈনুল দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মাধ্যমে কাজ করেন—পারভীন ট্রেডার্স ও মা অ্যাসোসিয়েট। অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে পারভীন ট্রেডার্সের মাধ্যমেই বেশি শিটের চালান খালাস করা হয়েছে।

প্রতি টন সিআর শিটে প্রায় ২৮ হাজার টাকা, এইচআর শিটে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা এবং জিপি শিটে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা শুল্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সুমি দায়িত্বে থাকার সময় মঈনুলের চালানগুলো তেমনভাবে খুলে পরীক্ষা করা হয়নি এবং মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি।

প্রায় দুই মাস আগে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়। সুমিকে সরিয়ে সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে দায়িত্ব দেওয়া হলে শিট আমদানির চালানগুলোতে যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয় বলে জানা গেছে।

এ সময় মঈনুলের পারভীন ট্রেডার্সের ২ হাজার ২৩৩ টন এইচআর ও সিআর শিট এবং ১০ হাজার ১৬২ টন জিপি শিট খালাসের তথ্য পাওয়া যায়।

এর মধ্যে সাতটি চালান মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে আটকে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রিগুলো হলো—সি-১১৫৫৫, সি-১১৫৪৮, সি-১১৫৫২, সি-১১৫৫৭, সি-১১৫৪৭, সি-১১৫৫৩ ও সি-১১৫৫৪।

এসব চালানে মিথ্যা ঘোষণার দায়ে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আটকে মামলা করার এক সপ্তাহের মধ্যেই আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মঈনুলের পক্ষে বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে ওই কর্মকর্তাকে সরানোর ক্ষেত্রে সাবেক আনস্টাফিং কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমি ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় ৪১ ব্যাচের কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে। মঈনুলের মা অ্যাসোসিয়েটের গাড়ির গ্রুপও তাঁর তত্ত্বাবধানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

শিটের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি থেকে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার তথ্যও রয়েছে।

চিঠির পর সঠিক ঘোষণা অনুযায়ী শিটের চালান খালাস শুরু হয়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে বলে অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একপর্যায়ে নতুন কমিশনার সঠিক যাচাই ছাড়া শিটের চালান খালাসে সম্মতি না দেওয়ায় প্রায় দেড় মাস পর এনবিআরের নির্দেশনায় সঠিক ঘোষণা দেওয়ার শর্তে চালান খালাস করা হয়।

সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকার সময় খালাস হওয়া চালানের প্রায় ৯০ শতাংশ কম শুল্কের শিট হিসেবে ঘোষণা করা হতো। পরবর্তী সময়ে চিত্রটি বদলে যায়। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ চালান বেশি শুল্কের শিট হিসেবে খালাস হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এর ফলে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ কমেছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

কমলাপুর কাস্টম হাউসে বদলি ও তথ্য গোপন করে পণ্য খালাসের অভিযোগ নতুন নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতে এক কমিশনার বদলি হওয়ার পরদিন সরকারি ছুটির দিনে মাত্র দুই ঘণ্টায় ৮২০ টন শিট মিথ্যা ঘোষণায় খালাস করা হয়েছিল। এ ঘটনায় পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মঈনুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া শিট-সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপের কারণে সিআইসির এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মঈনুল হোসেন তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তিনি কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি দেননি।

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, মামলা অনেকের নামেই হয়। সুমি দায়িত্বে থাকার সময় কেন চালান পরীক্ষা করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে তাঁরা শুধু সিআর ও এইচআর শিট আমদানি করেছিলেন।

খাদিজা পারভীন সুমিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকাকালে কোনো ধরনের শুল্ক ফাঁকি হয়নি। তিনি দায়িত্ব পালনকালে নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন এবং সাধারণত বিকেল ৫টার মধ্যেই অফিস ত্যাগ করতেন।

সন্ধ্যার পর তাঁর অধীনস্থ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলমের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমি বলেন, উপকমিশনার হিসেবে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের দায় তিনি নিতে পারেন না।

কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দীন বলেন, **“আমি কাস্টম হাউসে যোগ দেওয়ার পর থেকে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়মের চেষ্টা করেছে, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি।”**

তিনি আরও জানান, কাস্টম হাউসে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়ম মেনেই কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এনবিআরের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসির চিঠি, সাতটি চালান আটকে জরিমানা এবং অতীতের অনিয়মের অভিযোগ—সব মিলিয়ে কমলাপুর কাস্টম হাউসে শিট খালাস প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে মঈনুল হোসেন ও খাদিজা পারভীন সুমি উভয়েই তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, চালান, দায়িত্বকালীন সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।