১৩ লাখ টাকা দিলেই জাতীয় জাদুঘরে চাকরি নিশ্চিত’—এমন ফোনালাপ ফাঁসের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন সহকারী ও কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. সুমন মিয়া। অভিযোগের পর তাকে রাজধানীর আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে বদলি করা হলেও মাত্র সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে আবারও জাতীয় জাদুঘরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে তাকে।
গত ১২ আগস্ট জাতীয় জাদুঘরের প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে সুমন মিয়াকে জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন শাখায় সংযুক্ত করার বিষয়টি জানানো হয়।
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে গঠিত বিভাগীয় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে ফের জাতীয় জাদুঘরে সংযুক্ত করায় প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে চাকরি দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ দাবির একটি ফোনালাপ ফাঁস হলে বিষয়টি সামনে আসে। ওই ফোনালাপে সুমন মিয়াকে এক চাকরিপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়।
ফোনালাপে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বাজারদর অনুযায়ী রেট হলো ১৩ (১৩ লাখ)।’ ঘুষের পরিমাণ কমানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি নিজেকে কেবল টাকা যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও দাবি করেন।
এ সময় চাকরিপ্রত্যাশীকে চাকরি পাওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলেন সুমন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘টোটাল প্যাকেজ এক খরচেই। তোমার চিন্তা করার দরকার নাই। কী করা লাগবে, না লাগবে, তোমার জানার দরকার নাই এবং পরীক্ষায় পাস করারও কোনো প্রয়োজন নেই।’
ফোনালাপটি প্রকাশ্যে আসার পর জাতীয় জাদুঘরের বিভিন্ন পদে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগ পাওয়া ৪৮ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসে।
ঘটনার পর গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়।
অভিযোগের পর সুমন মিয়াকে জাতীয় জাদুঘর থেকে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে বদলি করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।
কিন্তু তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই গত ১২ আগস্ট তাকে আবারও জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিতর্কিত ৪৮ নিয়োগের মধ্যে সুমন মিয়ার নিজের বোন মোছা. তাসলিমা আক্তারের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাকে ‘টেলিফোন অপারেটর’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার অনলাইন আবেদনপত্রে সুমন মিয়ার ই-মেইল ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে তাসলিমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগের পরপরই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা এড়াতে তাসলিমা আক্তারকে ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে টেলিফোন অপারেটরের কোনো পদও ছিল না।
এপ্রিলের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় জুয়েল রানা নামের এক কর্মীর সঙ্গে সুমন ও তার সহযোগীদের বিরোধের অভিযোগ ওঠে। পরে জুয়েল রানাকে চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে বদলি করা হয়।
একই সময়ে তার স্ত্রী সোনিয়া আক্তারকেও বদলি করা হয়। সোনিয়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাকে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, বদলির সময় তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
সুমন মিয়ার ঘুষ দাবির অডিও ফাঁসের পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় জাতীয় জাদুঘরের কিপার (পরিচালক) মো. মনিরুল ইসলামকে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বিতর্কিত প্রক্সি পরীক্ষার সময় হল পরিদর্শকের দায়িত্বে ছিলেন মনিরুল ইসলাম। এ কারণে তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কমিটির সদস্যসচিব করা হয় ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মালেক মিলনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঊর্ধ্বতন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সমিরন রায়।
তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল জানতে চাইলে কমিটির সদস্যরা আহ্বায়কের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। আহ্বায়ক মো. মনিরুল ইসলামও এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সুমন মিয়াকে জাতীয় জাদুঘরে ফেরানোর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাবের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘অনেকেই তো অনেক কথা বলে। এগুলো সত্যি নয়। নিয়োগ, দুর্নীতি নিয়ে যেসব কথা মানুষ বলে, এগুলো সব মিথ্যা ও বানোয়াট।’
তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সুমনকে জাতীয় জাদুঘরে ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্তে তার ব্যাপারে ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছি। তাই আনা হয়েছে। আরও তদন্ত চলছে।’
এদিকে জাতীয় জাদুঘরের সচিব মো. সাদেকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত মো. সুমন মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সুমন মিয়াকে পুনরায় জাতীয় জাদুঘরে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।




















