বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী, ভারী মোটরযানের ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির যানবাহন চালিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে ভোলা সার্কেলে এ নিয়ম উপেক্ষা করে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে হালকা যানবাহনের চালকদের ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক আবু পলাশের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রাইভেটকার চালকদের কাছ থেকে ‘স্পিডমানি’ নিয়ে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও বাসের মতো ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ চালকরা ভারী যানবাহন চালানোর সুযোগ পাওয়ায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ আগস্ট ভোলা সার্কেলে ভারী যানবাহনের লাইসেন্সের জন্য ১৭৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে ১৩৯ জন অকৃতকার্য এবং ৩৯ জন উত্তীর্ণ হন।
পরীক্ষার্থী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উত্তীর্ণদের একটি অংশের ভারী যানবাহন চালানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। তারা মূলত প্রাইভেটকার চালিয়েই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় লার্নার নম্বর 32-18491882, 32-18492535, 32-18492540, 32-18495156, 32-18496425, 32-18496783, 32-18496833, 32-18499139, 32-17372063 এবং 32-18580198-সহ ১০ জনের নাম এসেছে।
শুধু ১১ আগস্ট নয়, এর আগেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২৮ জুলাই লার্নার নম্বর 32-18486539, 32-18249198, 32-17721515, 32-17606950, 32-17344748, 32-18307074, 32-18318440 ও 32-18143209-সহ আটজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
২১ জুলাই 32-18456156, 32-18458419, 32-18470065, 32-18470786, 32-18471407, 32-18472632, 32-18275545, 32-18476569, 32-18479399, 32-17840104, 32-18292889, 32-18317384, 32-17873981 ও 32-18555390-সহ ১৪ জনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া ৩০ জুন 32-18382980, 32-18384274, 32-18390744, 32-18226302 ও 32-17407706-সহ বিভিন্ন দিনে মোট ৩৭ জনকে অনিয়মের মাধ্যমে ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আবু পলাশ যেসব এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই দালালদের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের একটি চক্র সক্রিয় ছিল। তার ভাই বিপুল এই লেনদেনের বিষয়টি দেখভাল করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে ভারী যানবাহন চালানোর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
শেরপুরেও উঠেছিল আবু পলাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
এর আগে ২০২৩ সালে শেরপুর সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে আবু পলাশের বিরুদ্ধে ঘুষ না দিলে যোগ্য চালকদের অকৃতকার্য করার অভিযোগ ওঠে।
ওই বছরের ২ মে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে ‘শেরপুর বিআরটিএ ফের দুর্নীতির আখড়া’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরদিন তৎকালীন সহকারী পরিচালকের সুপারিশের ভিত্তিতে ৪ মে তাকে বিআরটিএর সদর কার্যালয়ে ক্লোজ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
পরে সদর কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় ‘লাভজনক’ সার্কেলে পদায়নের জন্য তদবির করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ তাকে সিরাজগঞ্জ সার্কেলে বদলি করা হলেও সেখানে যোগ দেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। পরে তদবিরের মাধ্যমে সেই বদলির আদেশ বাতিল করানোর অভিযোগ রয়েছে।
এর প্রায় ৪০ দিন পর তাকে ফরিদপুর সার্কেলে বদলি করা হয়। তবে ২০২৪ সালের ২ মে ‘প্যাসেঞ্জার ভয়েস’ পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেই বদলির আদেশও বাতিল হয় বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১ মার্চ বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর স্বাক্ষরিত আদেশে আবু পলাশকে ঢাকার সদর কার্যালয় থেকে ভোলা সার্কেলে বদলি করা হয়। আদেশের স্মারক নম্বর ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৪২৪।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘুষের বিনিময়ে অদক্ষ চালকদের হাতে ভারী যানবাহনের লাইসেন্স তুলে দেওয়া হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ চালকরাও ন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর একজন পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) বলেন, আবু পলাশের বিরুদ্ধে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি মাঠ পর্যায়ের সার্কেলে পদায়ন পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে মাঠ পর্যায়ের সার্কেলে পদায়নের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোটরযান পরিদর্শক আবু পলাশের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




















