নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫৭৯ জন। নিখোঁজদের বড় একটি অংশ পর্যটক এবং বিদেশি নাগরিক। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ৬টা পর্যন্ত নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্যের বরাতে এ সংখ্যা জানা গেছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে চিতওয়ানেই সবচেয়ে বেশি ৬৪ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এছাড়া ধাদিংয়ে ২৭, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ২২, গোরখায় ১৯, নুওয়াকোটে ১৩, তানাহুনে ৯ এবং রাসুয়ায় ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নেপাল পুলিশের ২৮ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজদের মধ্যে ৪৬৬ জন ২৮টি দেশের বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে ৫৪ জন মার্কিন নাগরিক এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া ১১৩ জন নেপালি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন নাগরিক রয়েছেন।
দুর্যোগে আহত ৪১ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে মহারাজগঞ্জের টিইউ টিচিং হাসপাতালে ২০ জন, ত্রিশূলী হাসপাতালে ৯ জন, ট্রমা সেন্টারে ৪ জন, বীর হাসপাতাল ও নরভিক হাসপাতালে ৩ জন করে এবং ছাউনির বীরেন্দ্র মিলিটারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত
বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের অবকাঠামোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাকা মহাসড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে দুর্গত এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার তৎপরতাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, তিমুরে, স্যাফ্রুবেশি, বেত্রাবতী, ত্রিশূলী বাজার ও দেবীঘাট এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যকে প্রাথমিক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষ করে নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান জেলার ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাসুয়ার গালছি-নুওয়াকোট ও স্যাফ্রুবেশি সড়ক এবং মুগলিং-নারায়ণগড় সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বরফ-পাথরের ধস থেকেই বন্যার সূত্রপাত
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাসুয়া-রাসুওয়াগাধি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে একটি বরফ-পাথরের ধস থেকে এই বন্যার সূত্রপাত হতে পারে।
ধসের কারণে ভোটেকোশি নদীর শাখা লহেন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের স্রোত তিমুরে হয়ে ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এর আগে বুধবার সকালে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে ভোটেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে সীমান্তবর্তী জনপদ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং কাঠমান্ডু-কেরুং বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আকাশপথে ১১৪ জন উদ্ধার
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে তিন মাসের জন্য দুর্যোগকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে নেপাল সরকার। আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, বাস্তুচ্যুতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্গতদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, নেপালি সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিচালনাকারীরা আকাশপথে ১১৪ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ৮৫ জনকে উদ্ধার করেছে।
তিমুরে থেকে ধুনছে ৬০ জন, তিমুরে থেকে ত্রিশূলী ১৩ জন, মাইলুং থেকে ৫ জন, বেত্রাবতী থেকে ৪ জন এবং ত্রিশূলী থেকে ৩ জনকে উদ্ধার করে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিচালনাকারীরা আরও ২৯ জনকে উদ্ধার করেছে। আটকে পড়া বাসিন্দাদের অবস্থান শনাক্ত করতে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ার সংকেত দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ছে
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতিতে ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জরুরি সহায়তা হিসেবে বিভিন্ন উৎস থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারত জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর তালিকা চেয়েছে। অন্যদিকে চীন তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং নেপালে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা সমন্বয় এবং তা যথাযথভাবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।




















