রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিভিডি) দুই চিকিৎসকের পদায়ন ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তাদের একজন স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্তিতে থাকা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজির (নিকডু) সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোরশেদ আলম এবং অন্যজন এনআইসিভিডির হাউজ স্টাফ ডা. আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খান।
বিশেষ করে ডা. মোরশেদ আলমের পদায়ন ঘিরে চিকিৎসকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ এবং আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, নিপীড়ন ও নানা অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখে ঢাকার বাইরে বদলির সুপারিশ করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।
ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত ২২ জুলাই ডা. মোরশেদ আলমকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে বদলির আদেশ দেওয়া হয়।
তবে এর মাত্র আট দিন পর, ৩০ জুলাই তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে অধ্যাপক পদে পদায়ন করা হয় বলে জানা গেছে।
বদলির আদেশের এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশেষায়িত একটি হাসপাতালে তার পদায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যতিক্রম হিসেবেও দেখছেন।
পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে চিকিৎসকদের একটি অংশের অভিযোগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাবশালী একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সুপারিশে ডা. মোরশেদ আলমকে এনআইসিভিডিতে পদায়ন করা হয়েছে।
তাদের দাবি, ওই চিকিৎসক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বারবার অনুরোধ ও চাপ প্রয়োগ করেন। পরে তার সুপারিশের ভিত্তিতেই ডা. মোরশেদের পদায়ন হয়।
তবে এ পদায়নের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বরং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, পদায়নের পর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত হন এবং এটি তাদের স্বপ্রণোদিত কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।
ডা. মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিগত সরকারের সময়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন—এমন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আয়োজিত মানববন্ধনেও তার অংশগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব ছবি ও ভিডিওর সত্যতা, সময়কাল এবং প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
নিকডুর বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগ সংস্কারের নামে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগেও অতীতে ডা. মোরশেদ আলম সমালোচিত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় বিভাগীয় সংস্কার ও কেনাকাটার বিভিন্ন কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়ম হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে ডা. মোরশেদ আলমের এনআইসিভিডিতে যোগদানের বিষয়ে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আপত্তি জানিয়েছে বলে জানা গেছে।
ড্যাবে এনআইসিভিডি, নিকডু ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, **“ডা. মোরশেদ আলমের সঙ্গে ড্যাবের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তিনি ড্যাবের সদস্যও নন।”**
তিনি আরও বলেন, “ডা. মোরশেদ আলম বিগত সরকারের আমলে নানা সুবিধা ভোগ করেছেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের ছবি ও প্রমাণ রয়েছে। তিনি ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাকে যোগদান করতে দেওয়া হবে না।
তবে ড্যাবের পক্ষ থেকে এমন অবস্থান নেওয়ার প্রশাসনিক বা আইনগত এখতিয়ার কতটুকু, সেটিও আলাদাভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. মোরশেদ আলম বলেন, **“আমার বিরুদ্ধে যা বলা হয়েছে, তা একদমই ঠিক নয়। বিশেষায়িত হাসপাতালে পদায়নের জন্য যেমন পরিচালকের সুপারিশ লাগে, এখানে হয়তোবা তেমনই ছিল।”**
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এনআইসিভিডিতে পদায়নের বিষয়টি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের একাংশের প্রশ্ন, মাত্র আট দিনের ব্যবধানে একজন চিকিৎসকের বদলির আদেশ পরিবর্তন করে বিশেষায়িত হাসপাতালে পদায়নের ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ওই পদায়নের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত সুপারিশ, প্রশাসনিক চাপ কিংবা আর্থিক লেনদেন ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনআইসিভিডিতে ডা. মোরশেদ আলমের পদায়ন ও ডা. আব্দুল্লাহ আল মুয়ীদ খানের পদায়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের নথি, সুপারিশ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলেই এ বিতর্কের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।




















