যশোরে যথাযোগ্য মর্যাদা ও শোকাবহ পরিবেশে ১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিলের ভয়াবহ গণহত্যা দিবস পালিত হয়েছে। শনিবার দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অন্যতম এই বর্বরোচিত অধ্যায়কে স্মরণ করেন যশোরের সর্বস্তরের মানুষ। সকালে শহরের শংকরপুর বধ্যভূমিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ এবং বিকেলে টাউন হল মাঠের রওশন আলী মঞ্চে স্মরণসভার মধ্য দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতের পর থেকে ৩রা এপ্রিল পর্যন্ত যশোরের স্থানীয় ইপিআর, পুলিশ এবং মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তবে ৪ঠা এপ্রিল যশোর সেনানিবাস থেকে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় ইতিহাসের এক নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড।
বর্বরোচিত গণহত্যার চিত্র
সেদিন হানাদার বাহিনী শহরের বিভিন্ন স্থানে নারকীয় তাণ্ডব চালায়:
* স্টেশন মাদ্রাসা: সকালে যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসায় কোরআন শরিফ অধ্যয়নরত মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৩ জনকে হত্যা করা হয়। শহীদদের মধ্যে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের আটজন সদস্য ছিলেন।
* ক্যাথলিক গির্জা: গির্জায় ঢুকে ইতালীয় ফাদার মারিও ভেরনেসিসহ ৮ জনকে হত্যা করা হয়।
* কোতোয়ালি থানা ও হাসপাতাল: কোতোয়ালি থানায় ৫ জন পুলিশ সদস্য এবং যশোর জেনারেল হাসপাতালে ১১ জন কর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী।
* আবাসিক এলাকা: শহরের বেজপাড়া, ষষ্ঠীতলা, শংকরপুর ও বারান্দীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ’ নিরীহ মানুষকে এদিন প্রাণ দিতে হয়।
শোক ও শ্রদ্ধায় দিনটি উদ্যাপন
শনিবার সকালে শংকরপুর বধ্যভূমিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। গণহত্যা দিবস পালন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন:
* বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট রবিউল আলম
* বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুল
* কমিটির আহ্বায়ক হারুন অর রশিদ
* সদস্য সচিব রিয়াদুর রহমান
* বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
স্মরণসভার দাবি: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সঠিক তালিকা
বিকেলে টাউন হল মাঠের রওশন আলী মঞ্চে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, ৪ঠা এপ্রিলের এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস বাঙালি জাতির এক কলঙ্কিত অধ্যায়। বক্তারা নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করেন।
একই সঙ্গে, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হলেও অনেক শহীদের নাম এখনো সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা গভীর আক্ষেপ ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা দ্রুত প্রকৃত শহীদদের তালিকা প্রণয়ন ও সংরক্ষণের জোর দাবি জানান।




















