১৯৭১ সালের এই দিনে যশোরের মাটিতে রচিত হয়েছিল এক বর্বরোচিত ও কলঙ্কিত অধ্যায়। রক্তপিপাসু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোর শহরে ঢুকে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে যশোরবাসী। মসজিদ, মাদ্রাসা, গির্জা থেকে শুরু করে হাসপাতাল— কোথাও রেহাই পায়নি সাধারণ মানুষ।
ইতিহাসের তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতের পর থেকে ৩রা এপ্রিল পর্যন্ত যশোরের স্থানীয় ইপিআর, পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ৪ঠা এপ্রিল সকালে পাকিস্তানি বাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও ট্যাংক নিয়ে শহরে প্রবেশ করে সেই প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয় এবং শুরু করে নির্বিচার নিধনযজ্ঞ।
এদিনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে যশোর রেলস্টেশন মাদ্রাসায়। সকালে সেখানে পবিত্র কোরআন শরিফ অধ্যয়নরত মুসল্লিদের ওপর অতর্কিত গুলি চালায় পাকিস্তানি সেনারা। এতে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের আট সদস্যসহ মোট ২৩ জন শহীদ হন। প্রত্যক্ষদর্শী শেখ আব্দুর রহিম ও জিয়াদ আলী খান সেই শিউরে ওঠা স্মৃতির বর্ণনায় জানান, মাদ্রাসার শিক্ষক ‘কাঠি হুজুর’ খ্যাত মাওলানা হাবিবুর রহমানকে হত্যার পর অন্যদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়।
গির্জা ও হাসপাতালে হামলা: ফাদার মারিও’র আত্মত্যাগ
হানাদারদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি পবিত্র উপাসনালয়ও। শহরের ক্যাথলিক গির্জায় ইতালীয় ফাদার মারিও ভেরনেসিসহ ৮ জনকে হত্যা করা হয়। ফাদার মারিওর অপরাধ ছিল তিনি ফাতিমা হাসপাতালে যুদ্ধাহত বাঙালিদের সেবা দিয়েছিলেন। একই দিনে পাকিস্তানি বাহিনী যশোর জেনারেল হাসপাতালে ঢুকে ১১ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে এবং কোতোয়ালি থানায় হামলা চালিয়ে ৫ জন পুলিশ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
সেদিন শহরের বেজপাড়া, ষষ্ঠীতলা, শংকরপুর ও বারান্দীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘরে ঢুকে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো শহর পরিণত হয় এক বিশাল বধ্যভূমিতে।
ভয়াল এই দিবসটি উপলক্ষে আজ যশোর শংকরপুর বধ্যভূমিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ এবং টাউন হল মাঠের রওশন আলী মঞ্চে স্মরণসভার আয়োজন করেছে ‘গণহত্যা দিবস পালন কমিটি’। তবে স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এই দিনে শহীদ হওয়া অনেকের নাম এখনো সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় গভীর আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারা দ্রুত সকল শহীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন।



















