রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সাবেক সার্ভেয়ার আজাদ রহমান, কানুনগো সাইফুল ইসলাম ও অফিস সহকারী মিলন মিয়ার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে মামলাভুক্ত জমির তথ্য গোপন, আদালতের নথিপত্র পরিবর্তন এবং কোটি কোটি টাকা উৎকোচের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযোগ দায়েরের ১৭ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
গত বছরের ৯ মার্চ পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও রংপুর সদরের ছয়জন ভূমিমালিক রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগটি তদন্ত করে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য রংপুর জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের পর দীর্ঘ ১৭ মাস পার হলেও তদন্ত সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
অভিযোগকারী জলিল মিয়াসহ পাঁচজনের লিখিত অভিযোগে বলা হয়, রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য ‘সাসেক-২’ প্রকল্পের আওতায় মহাসড়কের উভয় পাশে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এসব জমির মালিকানা নিয়ে পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও রংপুর সদরের বিভিন্ন জমির ক্ষেত্রে জেলা জজ আদালত ও উচ্চ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, অধিগ্রহণ করা জমিতে ৮ ধারার নোটিশ জারির পর কোনো মামলা বা আইনি বিরোধ থাকলে সেই জমির ক্ষতিপূরণ প্রদান করা যায় না। ২০১৯ সালের পরিপত্রের ৪ ধারাতেও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট নিয়ম উপেক্ষা করে মামলাভুক্ত জমির ক্ষতিপূরণের চেক দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে পীরগঞ্জ উপজেলার ওসমানপুর মৌজার এলএ কেস নং ৩১/২০-২১-এর অন্তর্ভুক্ত আটটি মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দাগের জমি নিয়ে দেওয়ানি, ল্যান্ড সার্ভে, সিআর ও রিট মামলা চলমান রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। দাগ নম্বরগুলোর মধ্যে রয়েছে ২১৫, ২২০, ২২১, ৩৩৬, ৮৯১, ৯৯২, ৯০০ ও ৪০১।
অভিযোগে আরও বলা হয়, দাগ নম্বর ৪০১-এর জমি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে ৪৯৬৮/২০০৪ নম্বর মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও আদালতের কাগজপত্র ও নথিপত্র পরিবর্তন করে অর্থের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান করা হয়েছে।
এ ছাড়া এলএ কেস নং ২৫/২০-২১-এ ১৮টি মামলা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ী-হরিপুর এলাকার দাগ নম্বর ২৫, ১৫২৮, ১৬৯৮, ১৭০০, ১৭১৯, ৪১১/৫১৬, ৪১৮ ও ৪১৯ নিয়ে মামলা রংপুর জজ আদালতে চলমান রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে এলএ কেস নং ১৯/২০-২১-এর আওতায় রংপুর সদর উপজেলার তাজহাট মৌজার দাগ নম্বর ৮০৭, ৯০৮, ৭৬৮ ও ৭৬৯; ইসলামপুর মৌজার ৬৭৫, ৬৭৮ ও ৬৮৭ এবং তালুক ধর্মদাস মৌজার ৭৯৭৬, ৭৯৭২ ও সাবেক ৫৮০৩ নম্বর দাগের জমি নিয়েও মামলা থাকার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলাভুক্ত জমির ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়ার অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগীরা প্রতিকার দাবি করেছেন।
অভিযোগটি রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের রাজস্ব শাখায় দাখিলের পর সহকারী কমিশনার সাদরুল আলম স্বাক্ষরিত স্মারক নং-০৫.৪৭.০০০০.০০৮.০৫.০১.২৩-এর মাধ্যমে রংপুর জেলা প্রশাসককে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত না হওয়ায় অভিযোগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারী জলিল মিয়া বলেন, “সার্ভেয়ার আজাদ রহমান টাকা হলেই সব করেন। আমরা তার ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও সেটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত তদন্ত চাই।”
এদিকে অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সার্ভেয়ার আজাদ রহমান বর্তমানে কানুনগো পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে তিনি দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় বদলি হন। পরে তদবির করে গত ২৫ আগস্ট আবার রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় যোগদান করেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, পাঁচ দিনের ব্যবধানে একজন কানুনগোকে সরিয়ে আজাদ রহমানকে রংপুরে বদলির আদেশ করানো হয়। এ দুটি আদেশই রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার উত্তম কুমার দাশ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রংপুর এলএ শাখার সাবেক সার্ভেয়ার ও বর্তমানে কানুনগো আজাদ রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
রংপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক মিজ ইসরাত জাহান বলেন, “আমি সদ্য যোগদান করেছি। এ বিষয়ে আমার জানা নেই।”
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ভূমিমালিকরা।




















