চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গত চার বছরে অন্তত ২৫০টি কনটেইনার উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে ও কাস্টমসের তথ্যভাণ্ডারে এসব কনটেইনার বন্দরের শেড বা ইয়ার্ডে থাকার তথ্য থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কনটেইনার গায়েব হয়নি; বরং কাস্টমসের দেওয়া তথ্য ও নথিতে অসঙ্গতি রয়েছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন কারণে আটকে রাখা এবং ডেলিভারি না নেওয়া প্রায় ২৫০টি কনটেইনারের অবস্থান যাচাই করতে গিয়ে এই অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এসব কনটেইনারের অবস্থান জানতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, আমদানি করা কোনো পণ্য সন্দেহজনক মনে হলে সেটিকে এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেমে ‘লক’ করে দেওয়া হয়। শতভাগ কায়িক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় শুল্ক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব কনটেইনার বন্দরের নিয়ন্ত্রণেই থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভুল ঘোষণায় পণ্য আমদানি করা হয়। পরে উচ্চ শুল্ক পরিশোধ করলে লোকসানের আশঙ্কায় কিছু আমদানিকারক কনটেইনার আর ছাড়িয়ে নেন না। এ ধরনের কনটেইনার পরে নিলামে তোলার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকগুলোর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৮৩টি, ২০২২ সালে ৬১টি, ২০২৩ সালে ৪০টি এবং ২০২৪ সালে ৬৬টি—মোট ২৫০টি কনটেইনার সিস্টেমে লক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডে সেগুলো পাওয়া যায়নি।
কাস্টমস সূত্র আরও জানায়, ২০২৫ সালে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে জব্দ করা দুটি কাপড়ভর্তি কনটেইনার নিলামে বিক্রি করা হয়। একটি প্রতিষ্ঠান নিলামে কনটেইনার দুটি কিনে অর্থ পরিশোধের পর বন্দরে গিয়ে সেগুলোর কোনো খোঁজ পায়নি। এরপরই কাগজে থাকা অন্যান্য কনটেইনারের অবস্থান যাচাই শুরু হয় এবং আরও অসঙ্গতি সামনে আসে।
অভিযোগ উঠেছে, বন্দরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও একটি অসাধু চক্র বিভিন্ন কৌশলে এসব কনটেইনার বন্দর এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তবে এসব ঘটনায় জড়িত কোনো সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত বা বিচারের আওতায় আনার তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
এদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনার গায়েব হওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছে।
বন্দর সচিব মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কাস্টমস ২৫০টি চালানের কথা বললেও প্রকৃত সংখ্যা ২৪৭টি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর মধ্যে ১৬৪টি চালানে ২৯৩টি ফুল কনটেইনার লোড (FCL) রয়েছে। এর মধ্যে ৮৮টি কনটেইনার কাস্টমস আউটপাসের মাধ্যমে ডেলিভারি হয়েছে, ৭০টি বিভিন্ন প্রাইভেট কনটেইনার ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ১৩১টি এখনও বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে রয়েছে। এছাড়া চারটি কনটেইনার নম্বর ভুল বা অসম্পূর্ণ হওয়ায় সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ৮৩টি লুজ কনটেইনার লোড (LCL) চালানের মধ্যে আটটি ডেলিভারি হয়েছে, ৩৫টি এখনও বন্দরের বিভিন্ন শেডে রয়েছে এবং বাকি ৪০টির ক্ষেত্রে কাস্টমসের দেওয়া বিল অব লেডিং (BL) নম্বরের সঙ্গে তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা থেকে কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যভাণ্ডারের অসঙ্গতি দূর করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




















