পাহাড় কাটা, বৃক্ষ নিধন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বসতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশে পাহাড় ধসের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন ড. মো. ইকবাল সরোয়ার। তিনি বলেন, পাহাড়কে তার স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে দিতে হবে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, দখল এবং বসতি স্থাপন বন্ধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে পাহাড় ধসের ঘটনা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ পাহাড়ই নরম বালিমাটি দিয়ে গঠিত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলে গেছে। আগে বর্ষাকালে দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে বৃষ্টি হলেও এখন দীর্ঘ খরার পর স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পাহাড়ের মাটি শুকিয়ে থাকে। ফলে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে পানি দ্রুত মাটির ভেতরে প্রবেশ করে বালিমাটিকে নরম ও আলগা করে দেয়। এতে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে ধস নামে।
ড. ইকবাল সরোয়ার বলেন, শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডও পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ। পাহাড় কেটে সমতল করা, গাছপালা নিধন এবং অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তোলার কারণে পাহাড় দুর্বল হয়ে পড়ছে। যেখানে মাটি কেটে ফেলা হয়, সেখানে সহজেই ফাটল সৃষ্টি হয় এবং ভারী বৃষ্টিতে ওই অংশ ধসে পড়ে।
তিনি বলেন, “পাহাড় বসবাসের জন্য নয়। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়কে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছি। পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিতে হবে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটা এবং সেখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন। তাদের একদিনে উচ্ছেদ করা বাস্তবসম্মত নয়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সচল রাখা, ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ এবং পাহাড়ের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় ব্যাপকভাবে পাহাড় ও বনভূমি উজাড় হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব এলাকায় গাছপালা কেটে বসতি স্থাপনের ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এর ফলে ভারী বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
পাহাড় রক্ষায় রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে ড. ইকবাল সরোয়ার বলেন, এক সরকারের নেওয়া পরিকল্পনা অনেক সময় পরবর্তী সরকারের আমলে ধারাবাহিকতা পায় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের মতিঝরনাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ পাহাড় ধসে বহু মানুষের প্রাণহানির পর গঠিত তদন্ত কমিটি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ৩৬টি সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেই সুপারিশের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, পাহাড় কাটা ও অবৈধ বসতি স্থাপন রোধে আইন ও নীতিমালার কোনো ঘাটতি নেই, সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়নে। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই জনবল সংকটের কথা জানায়। যদি সত্যিই জনবল কম থাকে, তাহলে তা দ্রুত বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থা, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, ভূ-প্রকৃতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাহাড় ধসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।




















