হাম ও ডেঙ্গুর একসঙ্গে বাড়তে থাকা সংক্রমণে দেশের স্বাস্থ্য খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে হামও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক হাসপাতালে রোগীদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি ৯৯০ জন মানুষের বিপরীতে রয়েছে মাত্র একটি হাসপাতালের শয্যা। এর মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৮৯ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১৪৮ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৮৬৬ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৭৬ জনের।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে ২৭ হাজার ৯০৮ জন বা প্রায় ১৭৬ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে ৭২ জন, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন। শুধু সেপ্টেম্বরেই আক্রান্ত হয়েছেন এর চেয়ে প্রায় ৮ হাজার বেশি মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬ হাজার ৪৫৮ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৬২ জনের।
ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল হিমশিম খাচ্ছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রোগীদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিতে হচ্ছে স্বজনদের। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও বাড়ছে রোগীর চাপ।
একই সঙ্গে হাম ও অন্যান্য রোগের রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নার্স ও ওয়ার্ডবয়ের সংকট থাকায় রোগীদের নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মহাখালীর ডিএনসিসি কভিড-১৯ হাসপাতালে বর্তমানে হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সেখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। প্রায় এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ থাকায় রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে সাড়ে ছয় মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ১ হাজার ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য জানিয়েছে। মৃতদের অধিকাংশই শিশু।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২১৮ জন। এ নিয়ে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৮ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ৭৪৮ জন।
হাম নিয়ন্ত্রণে দ্বিতীয় দফায় টিকাদান কর্মসূচি চালাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এখন পর্যন্ত ২ কোটি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০৫ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট বয়সের কোনো শিশু যাতে টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি টিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবের বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিভাগের পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুর ভরা মৌসুমে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। পাশাপাশি হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও কমেনি। কিছু হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে পরিস্থিতির অবনতি হলে হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্যালাইন, কিট ও ওষুধের সংকট নেই। তবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট রয়েছে। চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন এবং সাত হাজার নার্স নিয়োগের পরীক্ষা চলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ মনে করেন, ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, আগামী কয়েক দশকেও ডেঙ্গু দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগের চাপ মোকাবিলায় শুধু জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়, একই সঙ্গে পর্যাপ্ত হাসপাতাল শয্যা, দক্ষ জনবল, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা জোরদার করা জরুরি।





















