০৫:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

মেরুল বাড্ডায় রাজউকের ১১ একর জমি ২১ বছর ধরে দখলে, উঠছে ৩০০ কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৪:০০:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫০৭

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় রাজউকের প্রায় ১১ একর জমি দীর্ঘ ২১ বছর ধরে দখলে থাকার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের এই জমি উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিরুদ্ধে। এদিকে জমিকে ঘিরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬২ সালে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) বাড্ডা মৌজায় আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। একই বছরের ২৫ এপ্রিল আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জমিটির দখল ডিআইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ১৯৮৭ সালে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক করা হয়।

তবে ২০০৫ সাল থেকে জমির দখল নিয়ে একের পর এক রিট মামলা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জমিটি ঘিরে মোট পাঁচটি রিট মামলা করা হয়েছে। এসব মামলার কারণে জমি উদ্ধারের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে বলে রাজউকের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজের কাছাকাছি মূল সড়কসংলগ্ন ওই এলাকায় মাছ, মুরগি ও বাঁশের বড় বড় আড়ত গড়ে উঠেছে। রয়েছে কাঁচাবাজার ও বস্তি। ভোর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ট্রাকে মাছ, মুরগি ও বাঁশ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সেখানে ভিড় করেন।

এলাকায় ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ এবং ‘মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’-এর কার্যক্রমও দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আড়ত থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়।

জমিটিকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থায়ী দোকান দেওয়ার আশ্বাসে প্রায় ছয় হাজার সদস্যের কাছ থেকে দীর্ঘ সময়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাঁদা, কিস্তি, মামলা পরিচালনা ও অন্যান্য খরচের নামে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও সদস্যদের অনেকেই দোকান পাননি।

একাধিক সদস্যের দাবি, তাঁরা বছরের পর বছর টাকা পরিশোধ করলেও এখন তাঁদের জমা অর্থের কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।

সমিতির পক্ষ থেকে ওই জমির একটি অংশে মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা এবং জমি বরাদ্দের দাবি করা হলেও রাজউক জানিয়েছে, সমিতির নামে ওই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, জমির মালিকানা ও আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা নেওয়া হয়েছে। এমনকি ২০০৫ সালে রাজউকের উচ্ছেদ অভিযানের পরও সমিতির কার্যক্রম অন্য জায়গা থেকে চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জমি উদ্ধারে রাজউকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজউকের বিরুদ্ধে অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে এবং এসব মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে।

তিনি আরও বলেন, রাজউকের অনেক কর্মকর্তা কাজ করতে চান না; কাজ না করলেই তাঁদের লাভ—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এর বেশি মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবিরের দাবি, নিজের একটি দোকানের আশায় তিনি দীর্ঘদিন সমিতির সদস্য ছিলেন এবং নিয়মিত টাকা দিয়েছেন। ১৬ বছর পার হলেও দোকান পাননি।

আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) জানান, প্রায় ২০ বছরে তিনি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। দোকান পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় কিস্তি দেওয়া বন্ধ করলেও জমা দেওয়া অর্থের কোনো হদিস পাননি বলে তাঁর অভিযোগ।

সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন জানান, একসময় সদস্যসংখ্যা ছয় হাজারেরও বেশি ছিল। দীর্ঘ সময় চাঁদা দেওয়ার পরও সদস্যদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। তাঁর দাবি, সমিতির ভেতরে অনিয়ম ও কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগের কারণে কার্যক্রম প্রায় এক দশক ধরে স্থবির।

ভুক্তভোগীদের দাবি, জমির মালিকানা, রিট মামলা, সমিতির আর্থিক লেনদেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সংগৃহীত অর্থ—সবকিছু নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সদস্যদের জমা অর্থের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সর্বাধিক পঠিত

নড়াইলে আরাফাত মোল্যাকে কুপিয়ে হত্যা,

মেরুল বাড্ডায় রাজউকের ১১ একর জমি ২১ বছর ধরে দখলে, উঠছে ৩০০ কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ

আপডেট: ০৪:০০:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় রাজউকের প্রায় ১১ একর জমি দীর্ঘ ২১ বছর ধরে দখলে থাকার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের এই জমি উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিরুদ্ধে। এদিকে জমিকে ঘিরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬২ সালে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) বাড্ডা মৌজায় আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। একই বছরের ২৫ এপ্রিল আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জমিটির দখল ডিআইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ১৯৮৭ সালে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক করা হয়।

তবে ২০০৫ সাল থেকে জমির দখল নিয়ে একের পর এক রিট মামলা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জমিটি ঘিরে মোট পাঁচটি রিট মামলা করা হয়েছে। এসব মামলার কারণে জমি উদ্ধারের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে বলে রাজউকের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রামপুরা ব্রিজের কাছাকাছি মূল সড়কসংলগ্ন ওই এলাকায় মাছ, মুরগি ও বাঁশের বড় বড় আড়ত গড়ে উঠেছে। রয়েছে কাঁচাবাজার ও বস্তি। ভোর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ট্রাকে মাছ, মুরগি ও বাঁশ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সেখানে ভিড় করেন।

এলাকায় ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ এবং ‘মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’-এর কার্যক্রমও দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আড়ত থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়।

জমিটিকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থায়ী দোকান দেওয়ার আশ্বাসে প্রায় ছয় হাজার সদস্যের কাছ থেকে দীর্ঘ সময়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাঁদা, কিস্তি, মামলা পরিচালনা ও অন্যান্য খরচের নামে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও সদস্যদের অনেকেই দোকান পাননি।

একাধিক সদস্যের দাবি, তাঁরা বছরের পর বছর টাকা পরিশোধ করলেও এখন তাঁদের জমা অর্থের কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।

সমিতির পক্ষ থেকে ওই জমির একটি অংশে মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা এবং জমি বরাদ্দের দাবি করা হলেও রাজউক জানিয়েছে, সমিতির নামে ওই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, জমির মালিকানা ও আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা নেওয়া হয়েছে। এমনকি ২০০৫ সালে রাজউকের উচ্ছেদ অভিযানের পরও সমিতির কার্যক্রম অন্য জায়গা থেকে চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জমি উদ্ধারে রাজউকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজউকের বিরুদ্ধে অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে এবং এসব মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে।

তিনি আরও বলেন, রাজউকের অনেক কর্মকর্তা কাজ করতে চান না; কাজ না করলেই তাঁদের লাভ—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এর বেশি মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবিরের দাবি, নিজের একটি দোকানের আশায় তিনি দীর্ঘদিন সমিতির সদস্য ছিলেন এবং নিয়মিত টাকা দিয়েছেন। ১৬ বছর পার হলেও দোকান পাননি।

আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) জানান, প্রায় ২০ বছরে তিনি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। দোকান পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় কিস্তি দেওয়া বন্ধ করলেও জমা দেওয়া অর্থের কোনো হদিস পাননি বলে তাঁর অভিযোগ।

সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন জানান, একসময় সদস্যসংখ্যা ছয় হাজারেরও বেশি ছিল। দীর্ঘ সময় চাঁদা দেওয়ার পরও সদস্যদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। তাঁর দাবি, সমিতির ভেতরে অনিয়ম ও কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগের কারণে কার্যক্রম প্রায় এক দশক ধরে স্থবির।

ভুক্তভোগীদের দাবি, জমির মালিকানা, রিট মামলা, সমিতির আর্থিক লেনদেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সংগৃহীত অর্থ—সবকিছু নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সদস্যদের জমা অর্থের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।