১২:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বান্দরবানে বন নিধন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:৪২:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫৩০

দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বান্দরবানের বনাঞ্চলে গাছ নিধন, কাঠ পাচার ও ঘুষ বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে বান্দরবান সদর রেঞ্জের এক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকলেও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা। এদিকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বান্দরবান বিভাগীয় বন বিভাগ।

বন বিভাগ সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বনের গাছ কর্তন, ভুয়া টিপি (চলাচল পাস) ব্যবহার, কাঠ পাচার এবং বিভিন্ন পদে পোস্টিংয়ের নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক বন সংরক্ষক (সিএফ) মোল্যা রেজাউল করিমের সময় সাইফুল ইসলাম বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব পান। এরপর তার প্রভাব ও প্রশ্রয়ে বান্দরবান বন বিভাগে নানা অনিয়ম চলে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে, বান্দরবান বন বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং পেতে নির্ধারিত হারে অর্থ দিতে হয়। রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বন স্টেশনে পোস্টিংয়ের জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, রেঞ্জ সহযোগীর জন্য ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ডদের সদর রেঞ্জ ও বিভিন্ন স্টেশনে পোস্টিংয়ের জন্য ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন নথি বা প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বন বিভাগের টিপি শাখাকে ঘিরেও নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতি টিপির বিপরীতে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ হয়।

সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি টিপিতে ডিএফওর নামে ২ হাজার ৩০০ টাকা, সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ৬০০ টাকা, রেঞ্জ কর্মকর্তা ৮০০ টাকা, অফিস সেকশন ৬০০ টাকা, ফরেস্টার ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ডের নামে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাগ করা হয়। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার সদর রেঞ্জের টিপি শাখায় এই অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া স্টক চেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৯ টাকা এবং জোত পারমিটের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পারমিটের পর ট্রাকে কাঠ লোড করার ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং বৈধ টিপির আড়ালে অবৈধ কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে সুয়ালক চেক স্টেশনে ট্রাকপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

লটারিতে নির্ধারণ হয় কাঠ পাচারের অভিযোগ

বান্দরবানে দেড় শতাধিক কাঠ ব্যবসায়ী রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, লটারির মাধ্যমে কোন ব্যবসায়ীর কাঠ বৈধ টিপির আড়ালে পরিবহন করা হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। পরে ট্রাক লোডের আগেই ওই তালিকা বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের ফলে বান্দরবানের বনাঞ্চলে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও কাঠ পাচার বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ি বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “আমি নতুন এসেছি। এসব অভিযোগ সঠিক নয়।”

সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বন বিভাগ। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে টাকা নেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে। সরাসরি কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ডিএফও বলেন, “আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে।”

বন বিভাগের সার্বিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমি সব জায়গায় সতর্কবার্তা দিয়েছি, যেন কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে কেউ জড়িয়ে না পড়ে। দুর্নীতির প্রশ্নে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি।”

অভিযোগের সত্যতা তদন্তে কী উঠে আসে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সর্বাধিক পঠিত

চট্টগ্রামে চোরাই মোটরসাইকেল কেনাবেচা, পুলিশ কনস্টেবলসহ আটক ৫

বান্দরবানে বন নিধন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

আপডেট: ০৯:৪২:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বান্দরবানের বনাঞ্চলে গাছ নিধন, কাঠ পাচার ও ঘুষ বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে বান্দরবান সদর রেঞ্জের এক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকলেও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা। এদিকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বান্দরবান বিভাগীয় বন বিভাগ।

বন বিভাগ সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে বনের গাছ কর্তন, ভুয়া টিপি (চলাচল পাস) ব্যবহার, কাঠ পাচার এবং বিভিন্ন পদে পোস্টিংয়ের নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক বন সংরক্ষক (সিএফ) মোল্যা রেজাউল করিমের সময় সাইফুল ইসলাম বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব পান। এরপর তার প্রভাব ও প্রশ্রয়ে বান্দরবান বন বিভাগে নানা অনিয়ম চলে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে, বান্দরবান বন বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং পেতে নির্ধারিত হারে অর্থ দিতে হয়। রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বন স্টেশনে পোস্টিংয়ের জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, রেঞ্জ সহযোগীর জন্য ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ডদের সদর রেঞ্জ ও বিভিন্ন স্টেশনে পোস্টিংয়ের জন্য ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন নথি বা প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বন বিভাগের টিপি শাখাকে ঘিরেও নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতি টিপির বিপরীতে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ হয়।

সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি টিপিতে ডিএফওর নামে ২ হাজার ৩০০ টাকা, সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ৬০০ টাকা, রেঞ্জ কর্মকর্তা ৮০০ টাকা, অফিস সেকশন ৬০০ টাকা, ফরেস্টার ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ডের নামে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাগ করা হয়। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার সদর রেঞ্জের টিপি শাখায় এই অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া স্টক চেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৯ টাকা এবং জোত পারমিটের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পারমিটের পর ট্রাকে কাঠ লোড করার ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং বৈধ টিপির আড়ালে অবৈধ কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে সুয়ালক চেক স্টেশনে ট্রাকপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

লটারিতে নির্ধারণ হয় কাঠ পাচারের অভিযোগ

বান্দরবানে দেড় শতাধিক কাঠ ব্যবসায়ী রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, লটারির মাধ্যমে কোন ব্যবসায়ীর কাঠ বৈধ টিপির আড়ালে পরিবহন করা হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। পরে ট্রাক লোডের আগেই ওই তালিকা বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের ফলে বান্দরবানের বনাঞ্চলে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও কাঠ পাচার বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ি বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “আমি নতুন এসেছি। এসব অভিযোগ সঠিক নয়।”

সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বন বিভাগ। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে টাকা নেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে। সরাসরি কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ডিএফও বলেন, “আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে।”

বন বিভাগের সার্বিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমি সব জায়গায় সতর্কবার্তা দিয়েছি, যেন কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে কেউ জড়িয়ে না পড়ে। দুর্নীতির প্রশ্নে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি।”

অভিযোগের সত্যতা তদন্তে কী উঠে আসে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।