০১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

৫৫ কেজি স্বর্ণ চুরির তিন বছর পরও অরক্ষিত ঢাকা কাস্টম হাউজের মূল্যবান গুদাম

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:৩৫:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫৩৫

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের কাছ থেকে আটক ও চোরাচালানের মাধ্যমে জব্দ করা স্বর্ণ, রূপা, হীরা, দেশি-বিদেশি মুদ্রাসহ মূল্যবান সামগ্রী রাখা হয় ঢাকা কাস্টম হাউজের মূল্যবান শুল্ক গুদামে। কিন্তু প্রায় ৫৫ কেজি স্বর্ণ চুরির ঘটনা প্রকাশের তিন বছর পরও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

চাপ ডোরবিশিষ্ট ১৮ আরসিসি দেয়াল, ইস্পাত বেষ্টনী, সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা, নাইটভিশন ক্যামেরা, দীর্ঘমেয়াদি সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, সিকিউরিটি অ্যালার্ম ও অটোমেটেড অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

সম্প্রতি ঢাকা কাস্টম হাউজের গঠিত একটি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে এসব নিরাপত্তা দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত গুদাম পরিদর্শন ও মূল্যায়নের পর কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ করেছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা কাস্টম হাউজের এই মূল্যবান গুদাম থেকে প্রায় ৫৫ কেজি ৫০১ গ্রাম স্বর্ণ চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। সে সময় চুরি হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

যাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা স্বর্ণের বার ও অলঙ্কার ওই গুদামেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। চুরির ঘটনা সামনে আসার পর গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। এ ঘটনায় কাস্টম হাউজের পক্ষ থেকে মামলা করা হয় এবং একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

মামলার পর গুদামে দায়িত্ব পালন করা একাধিক কর্মকর্তা আটক ও কারাগারে যান। কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয় এবং কেউ কেউ চাকরিও হারান। আলোচিত ওই মামলার তদন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) করছে বলে জানা গেছে।

তখন গুদামের দেয়াল, দরজা, সিসিটিভি ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন বছর পরও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মূল্যবান শুল্ক গুদামে পণ্য রক্ষণাবেক্ষণ ও গুদাম ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২১ অনুযায়ী এ ধরনের গুদামে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা।

নির্দেশনা অনুযায়ী, মূল্যবান শুল্ক গুদাম অধিকতর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চাপ ডোরবিশিষ্ট ১৮ আরসিসি দেয়াল দিয়ে নির্মাণের কথা। কিন্তু ঢাকা কাস্টম হাউজের মূল্যবান গুদাম সাধারণ দেয়াল দিয়ে তৈরি।

এ ছাড়া বিশেষ নিরাপত্তার জন্য ইস্পাত বেষ্টনী এবং সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা স্থাপনের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু পরিদর্শনে কমিটির সদস্যরা দেখতে পান, গুদামের মূল প্রবেশপথে রয়েছে একটি লোহার কেচি গেট। ভেতরের দুটি পৃথক কক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে সাধারণ কাঠের দরজা।

ফলে গুদামে সংরক্ষিত স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী আবারও চুরির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল্যবান গুদামে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও সেটিও নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেছে কমিটি।

গুদামের ভেতরে ও বাইরে কয়েকটি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু এসব ক্যামেরার ধারণ করা ফুটেজ এক মাসের বেশি সংরক্ষণ করা হয় না।

ফলে এক মাসের বেশি সময় আগে গুদামে কোনো অনিয়ম, চুরি কিংবা সন্দেহজনক যাতায়াত ঘটলে তা পরবর্তীতে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, গুদামের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কাস্টম হাউজের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ফলে কাস্টম হাউজের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে গুদামটি ডিজিটালি মনিটরিং করা সম্ভব হচ্ছে না।

কমিটি মূল্যবান গুদামে উন্নতমানের নাইটভিশন সিসিটিভি স্থাপন, সেগুলো কাস্টম হাউজের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করা, এক্সেস কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু এবং দীর্ঘ সময়ের ফুটেজ সংরক্ষণের সুপারিশ করেছে।

গুদামের অগ্নি ও চুরি প্রতিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যবান শুল্ক গুদামে অটোমেটেড ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই। নেই সিকিউরিটি অ্যালার্ম বা অ্যান্টি-থেফট অ্যালার্মও।

ফলে গুদামে আগুন লাগলে দ্রুত সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবান সামগ্রী রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। একইভাবে রাতে বা অন্য কোনো সময় কেউ গুদামে প্রবেশের চেষ্টা করলেও অ্যালার্মের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সতর্ক হওয়ার সুযোগ সীমিত।

মূল্যবান গুদামে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তা অ্যালার্ম ব্যবস্থা স্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
মূল্যবান গুদামে বিভিন্ন শিফটে চারজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের কাজের মধ্যে যাত্রীদের কাছ থেকে আটক করা স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।

কিন্তু কর্মকর্তাদের কাজের জন্য নির্ধারিত জায়গাও পর্যাপ্ত নয়।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাস্টমস কর্মকর্তা ও নথি সংরক্ষণের জন্য রয়েছে একটি ছোট কক্ষ, একটি ডেস্ক ও একটি কম্পিউটার। দায়িত্বের তুলনায় এসব সুবিধা অপ্রতুল।

কমিটি কক্ষের পরিসর বাড়ানো এবং ডেস্ক ও কম্পিউটারের সংখ্যা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, এই গুদামে মূলত স্বর্ণবার, স্বর্ণপিণ্ড, স্বর্ণালঙ্কার, রৌপ্যবার, রৌপ্যপিণ্ড, রৌপ্য অলঙ্কার, দেশি-বিদেশি মুদ্রা, হীরা এবং স্বর্ণ, রূপা বা হীরার তৈরি অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী রাখার কথা।

কিন্তু পরিদর্শনের সময় কমিটির সদস্যরা গুদামে বিভিন্ন মামলার আলামত, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনসহ মূল্যবান গুদামে সংরক্ষণযোগ্য নয়—এমন বিভিন্ন পণ্য দেখতে পান।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধাতুর তৈরি কয়েকটি মূর্তিও গুদামে রয়েছে। এগুলো জাদুঘর বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের পুরোনো মালামালে গুদামটি প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে আটক করা মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরোনো পণ্যের কারণে গুদামের ভেতরের পরিবেশও দুর্গন্ধময় হয়ে উঠেছে। রয়েছে ইঁদুরের ব্যাপক উৎপাত।

এ অবস্থায় গুদামে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে। ইঁদুর নিধনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

গুদামের বৈদ্যুতিক তারগুলোও সংস্কার বা মেরামতের প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই তারগুলো মেরামতের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বাল্ব স্থাপন এবং অন্যান্য সিভিল ওয়ার্ক দ্রুত সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের স্বর্ণ চুরির ঘটনা সামনে আসার পর গুদামের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তখন নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হয়।

কিন্তু নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালের স্থায়ী আদেশে নির্ধারিত অনেক মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

ফলে ২০২৩ সালের চুরির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থায়ী ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা গড়ে তোলা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনবিআরের কর্মকর্তার হতাশা
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মূল্যবান গুদামের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। কিন্তু প্রতিবেদনে যা দেখলাম, তা হতাশাজনক।”

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এনবিআর আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আবারও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী দেশে প্রবেশ ও বহির্গমন করেন। তাঁদের কাছ থেকে জব্দ করা স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর একটি অংশ এই গুদামেই সংরক্ষণ করা হয়।

এ কারণে গুদামটির নিরাপত্তা শুধু কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জব্দকৃত আলামত সংরক্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

২০২৩ সালের বড় স্বর্ণ চুরির পরও যদি গুদামে সুরক্ষিত দেয়াল, নিরাপদ দরজা, কেন্দ্রীয় সিসিটিভি মনিটরিং, দীর্ঘমেয়াদি ফুটেজ সংরক্ষণ, অ্যান্টি-থেফট অ্যালার্ম ও আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঘটলে তা প্রতিরোধ বা দ্রুত শনাক্ত করা কতটা সম্ভব হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করে দ্রুত গুদামটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নির্ধারিত মানে উন্নীত করার দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

সর্বাধিক পঠিত

চট্টগ্রামে চোরাই মোটরসাইকেল কেনাবেচা, পুলিশ কনস্টেবলসহ আটক ৫

৫৫ কেজি স্বর্ণ চুরির তিন বছর পরও অরক্ষিত ঢাকা কাস্টম হাউজের মূল্যবান গুদাম

আপডেট: ০৯:৩৫:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের কাছ থেকে আটক ও চোরাচালানের মাধ্যমে জব্দ করা স্বর্ণ, রূপা, হীরা, দেশি-বিদেশি মুদ্রাসহ মূল্যবান সামগ্রী রাখা হয় ঢাকা কাস্টম হাউজের মূল্যবান শুল্ক গুদামে। কিন্তু প্রায় ৫৫ কেজি স্বর্ণ চুরির ঘটনা প্রকাশের তিন বছর পরও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

চাপ ডোরবিশিষ্ট ১৮ আরসিসি দেয়াল, ইস্পাত বেষ্টনী, সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা, নাইটভিশন ক্যামেরা, দীর্ঘমেয়াদি সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, সিকিউরিটি অ্যালার্ম ও অটোমেটেড অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

সম্প্রতি ঢাকা কাস্টম হাউজের গঠিত একটি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে এসব নিরাপত্তা দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত গুদাম পরিদর্শন ও মূল্যায়নের পর কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ করেছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা কাস্টম হাউজের এই মূল্যবান গুদাম থেকে প্রায় ৫৫ কেজি ৫০১ গ্রাম স্বর্ণ চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। সে সময় চুরি হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

যাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা স্বর্ণের বার ও অলঙ্কার ওই গুদামেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। চুরির ঘটনা সামনে আসার পর গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। এ ঘটনায় কাস্টম হাউজের পক্ষ থেকে মামলা করা হয় এবং একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

মামলার পর গুদামে দায়িত্ব পালন করা একাধিক কর্মকর্তা আটক ও কারাগারে যান। কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয় এবং কেউ কেউ চাকরিও হারান। আলোচিত ওই মামলার তদন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) করছে বলে জানা গেছে।

তখন গুদামের দেয়াল, দরজা, সিসিটিভি ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন বছর পরও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মূল্যবান শুল্ক গুদামে পণ্য রক্ষণাবেক্ষণ ও গুদাম ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২১ অনুযায়ী এ ধরনের গুদামে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা।

নির্দেশনা অনুযায়ী, মূল্যবান শুল্ক গুদাম অধিকতর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চাপ ডোরবিশিষ্ট ১৮ আরসিসি দেয়াল দিয়ে নির্মাণের কথা। কিন্তু ঢাকা কাস্টম হাউজের মূল্যবান গুদাম সাধারণ দেয়াল দিয়ে তৈরি।

এ ছাড়া বিশেষ নিরাপত্তার জন্য ইস্পাত বেষ্টনী এবং সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা স্থাপনের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু পরিদর্শনে কমিটির সদস্যরা দেখতে পান, গুদামের মূল প্রবেশপথে রয়েছে একটি লোহার কেচি গেট। ভেতরের দুটি পৃথক কক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে সাধারণ কাঠের দরজা।

ফলে গুদামে সংরক্ষিত স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী আবারও চুরির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল্যবান গুদামে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও সেটিও নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেছে কমিটি।

গুদামের ভেতরে ও বাইরে কয়েকটি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু এসব ক্যামেরার ধারণ করা ফুটেজ এক মাসের বেশি সংরক্ষণ করা হয় না।

ফলে এক মাসের বেশি সময় আগে গুদামে কোনো অনিয়ম, চুরি কিংবা সন্দেহজনক যাতায়াত ঘটলে তা পরবর্তীতে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, গুদামের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কাস্টম হাউজের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ফলে কাস্টম হাউজের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে গুদামটি ডিজিটালি মনিটরিং করা সম্ভব হচ্ছে না।

কমিটি মূল্যবান গুদামে উন্নতমানের নাইটভিশন সিসিটিভি স্থাপন, সেগুলো কাস্টম হাউজের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করা, এক্সেস কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু এবং দীর্ঘ সময়ের ফুটেজ সংরক্ষণের সুপারিশ করেছে।

গুদামের অগ্নি ও চুরি প্রতিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যবান শুল্ক গুদামে অটোমেটেড ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই। নেই সিকিউরিটি অ্যালার্ম বা অ্যান্টি-থেফট অ্যালার্মও।

ফলে গুদামে আগুন লাগলে দ্রুত সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবান সামগ্রী রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। একইভাবে রাতে বা অন্য কোনো সময় কেউ গুদামে প্রবেশের চেষ্টা করলেও অ্যালার্মের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সতর্ক হওয়ার সুযোগ সীমিত।

মূল্যবান গুদামে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তা অ্যালার্ম ব্যবস্থা স্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
মূল্যবান গুদামে বিভিন্ন শিফটে চারজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের কাজের মধ্যে যাত্রীদের কাছ থেকে আটক করা স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।

কিন্তু কর্মকর্তাদের কাজের জন্য নির্ধারিত জায়গাও পর্যাপ্ত নয়।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাস্টমস কর্মকর্তা ও নথি সংরক্ষণের জন্য রয়েছে একটি ছোট কক্ষ, একটি ডেস্ক ও একটি কম্পিউটার। দায়িত্বের তুলনায় এসব সুবিধা অপ্রতুল।

কমিটি কক্ষের পরিসর বাড়ানো এবং ডেস্ক ও কম্পিউটারের সংখ্যা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, এই গুদামে মূলত স্বর্ণবার, স্বর্ণপিণ্ড, স্বর্ণালঙ্কার, রৌপ্যবার, রৌপ্যপিণ্ড, রৌপ্য অলঙ্কার, দেশি-বিদেশি মুদ্রা, হীরা এবং স্বর্ণ, রূপা বা হীরার তৈরি অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী রাখার কথা।

কিন্তু পরিদর্শনের সময় কমিটির সদস্যরা গুদামে বিভিন্ন মামলার আলামত, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনসহ মূল্যবান গুদামে সংরক্ষণযোগ্য নয়—এমন বিভিন্ন পণ্য দেখতে পান।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধাতুর তৈরি কয়েকটি মূর্তিও গুদামে রয়েছে। এগুলো জাদুঘর বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের পুরোনো মালামালে গুদামটি প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে আটক করা মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরোনো পণ্যের কারণে গুদামের ভেতরের পরিবেশও দুর্গন্ধময় হয়ে উঠেছে। রয়েছে ইঁদুরের ব্যাপক উৎপাত।

এ অবস্থায় গুদামে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে। ইঁদুর নিধনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

গুদামের বৈদ্যুতিক তারগুলোও সংস্কার বা মেরামতের প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই তারগুলো মেরামতের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বাল্ব স্থাপন এবং অন্যান্য সিভিল ওয়ার্ক দ্রুত সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের স্বর্ণ চুরির ঘটনা সামনে আসার পর গুদামের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তখন নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হয়।

কিন্তু নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালের স্থায়ী আদেশে নির্ধারিত অনেক মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

ফলে ২০২৩ সালের চুরির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থায়ী ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা গড়ে তোলা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনবিআরের কর্মকর্তার হতাশা
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মূল্যবান গুদামের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। কিন্তু প্রতিবেদনে যা দেখলাম, তা হতাশাজনক।”

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এনবিআর আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আবারও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী দেশে প্রবেশ ও বহির্গমন করেন। তাঁদের কাছ থেকে জব্দ করা স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর একটি অংশ এই গুদামেই সংরক্ষণ করা হয়।

এ কারণে গুদামটির নিরাপত্তা শুধু কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জব্দকৃত আলামত সংরক্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

২০২৩ সালের বড় স্বর্ণ চুরির পরও যদি গুদামে সুরক্ষিত দেয়াল, নিরাপদ দরজা, কেন্দ্রীয় সিসিটিভি মনিটরিং, দীর্ঘমেয়াদি ফুটেজ সংরক্ষণ, অ্যান্টি-থেফট অ্যালার্ম ও আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঘটলে তা প্রতিরোধ বা দ্রুত শনাক্ত করা কতটা সম্ভব হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করে দ্রুত গুদামটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নির্ধারিত মানে উন্নীত করার দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।