০৯:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আকিজ সিমেন্টে ১৪৮ কোটি টাকার ভ্যাট অনিয়মের অভিযোগ, এনবিআরের নিরীক্ষায় নানা অসঙ্গতি

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:২০:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৮

আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকার অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বিভাগের নিরীক্ষায় এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে মোট ৭১ কোটি ১৬ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৭ টাকা অবৈধ রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সময়ে প্রায় ৭৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৬৭ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর আকিজ সিমেন্টের নিরীক্ষার জন্য এলটিইউ একটি দল গঠন করে। দলটি ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রি, ব্যয়, ভ্যাট-সংক্রান্ত নথি ও বার্ষিক প্রতিবেদন যাচাই করে। নিরীক্ষা শেষে চলতি বছরের ২৮ জুন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কাছে দাবিনামাসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকিজ সিমেন্ট বিভিন্ন উপকরণ ও সেবার বিপরীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে রেয়াত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উপকরণ নয়—এমন পণ্য ও সেবার বিপরীতে রেয়াত নেওয়া, অতিরিক্ত উপকরণ ব্যবহারের হিসাব দেখানো এবং উপকরণ-উৎপাদ সহগ যথাযথভাবে দাখিল না করেও রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে উপকরণ নয়—এমন প্রায় ৬০ কোটি ৭৪ লাখ ৭১ হাজার ৭১৭ টাকার পণ্য বা সেবার বিপরীতে প্রায় ৮ কোটি ৭১ লাখ ৬০ হাজার ৭৮৫ টাকা রেয়াত নেওয়া হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অতিরিক্ত ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন, গ্রানুলেটেড ব্লাস্ট ফার্নেস স্লাগ ও পলিব্যাগ ব্যবহারের বিপরীতে কয়েক দফায় অবৈধ রেয়াত নেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।

নিরীক্ষা দল উপকরণ-উৎপাদ সহগ ও ভ্যাট রিটার্ন যাচাই করে আরও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে। প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন উপকরণের বিপরীতে নিয়মবহির্ভূত রেয়াত গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন উপকরণ-উৎপাদ সহগ দাখিল না করেও রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ভ্যাট ফাঁকির ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের বেতন ও মজুরি, অবচয় ও মুনাফাসহ বিভিন্ন খাতে প্রদর্শিত অর্থের বিপরীতে প্রযোজ্য ভ্যাট পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে আকিজ ব্র্যান্ডের কম্পোজিট সিমেন্টের বিপুল পরিমাণ উৎপাদন দেখানো হয়নি বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই অর্থবছরে প্রায় ৭৪ কোটি ৮২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৮ টাকার পণ্য বা সিমেন্ট সরবরাহের তথ্যের বিপরীতে প্রযোজ্য ভ্যাট পরিশোধ না করার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ট্রেড রিসিভেবল’ খাতেও বিপুল পরিমাণ অর্থের ওপর ভ্যাট পরিশোধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ‘অ্যাডভান্স এগেইনস্ট পারচেজ অ্যান্ড এক্সপেন্স’সহ বিভিন্ন খাতে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করা বা কর্তন করা হলেও সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৭৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৬৭ টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আকিজ গ্রুপের চেয়ারম্যান এস কে নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ জসিম উদ্দিনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আকিজ রিসোর্ট ও আকিজ সিমেন্টের চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার তৌফিক হাসান জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানাতে হবে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক সদস্য বলেন, আইন অনুযায়ী রেয়াত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আকিজ সিমেন্টের ক্ষেত্রে রেয়াত গ্রহণে অনিয়ম হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে; এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত

আকিজ সিমেন্টে ১৪৮ কোটি টাকার ভ্যাট অনিয়মের অভিযোগ, এনবিআরের নিরীক্ষায় নানা অসঙ্গতি

আকিজ সিমেন্টে ১৪৮ কোটি টাকার ভ্যাট অনিয়মের অভিযোগ, এনবিআরের নিরীক্ষায় নানা অসঙ্গতি

আপডেট: ০৯:২০:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকার অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বিভাগের নিরীক্ষায় এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে মোট ৭১ কোটি ১৬ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৭ টাকা অবৈধ রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সময়ে প্রায় ৭৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৬৭ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর আকিজ সিমেন্টের নিরীক্ষার জন্য এলটিইউ একটি দল গঠন করে। দলটি ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রি, ব্যয়, ভ্যাট-সংক্রান্ত নথি ও বার্ষিক প্রতিবেদন যাচাই করে। নিরীক্ষা শেষে চলতি বছরের ২৮ জুন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কাছে দাবিনামাসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকিজ সিমেন্ট বিভিন্ন উপকরণ ও সেবার বিপরীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে রেয়াত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উপকরণ নয়—এমন পণ্য ও সেবার বিপরীতে রেয়াত নেওয়া, অতিরিক্ত উপকরণ ব্যবহারের হিসাব দেখানো এবং উপকরণ-উৎপাদ সহগ যথাযথভাবে দাখিল না করেও রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে উপকরণ নয়—এমন প্রায় ৬০ কোটি ৭৪ লাখ ৭১ হাজার ৭১৭ টাকার পণ্য বা সেবার বিপরীতে প্রায় ৮ কোটি ৭১ লাখ ৬০ হাজার ৭৮৫ টাকা রেয়াত নেওয়া হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অতিরিক্ত ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন, গ্রানুলেটেড ব্লাস্ট ফার্নেস স্লাগ ও পলিব্যাগ ব্যবহারের বিপরীতে কয়েক দফায় অবৈধ রেয়াত নেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।

নিরীক্ষা দল উপকরণ-উৎপাদ সহগ ও ভ্যাট রিটার্ন যাচাই করে আরও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে। প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন উপকরণের বিপরীতে নিয়মবহির্ভূত রেয়াত গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন উপকরণ-উৎপাদ সহগ দাখিল না করেও রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ভ্যাট ফাঁকির ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের বেতন ও মজুরি, অবচয় ও মুনাফাসহ বিভিন্ন খাতে প্রদর্শিত অর্থের বিপরীতে প্রযোজ্য ভ্যাট পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে আকিজ ব্র্যান্ডের কম্পোজিট সিমেন্টের বিপুল পরিমাণ উৎপাদন দেখানো হয়নি বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই অর্থবছরে প্রায় ৭৪ কোটি ৮২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৮ টাকার পণ্য বা সিমেন্ট সরবরাহের তথ্যের বিপরীতে প্রযোজ্য ভ্যাট পরিশোধ না করার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ট্রেড রিসিভেবল’ খাতেও বিপুল পরিমাণ অর্থের ওপর ভ্যাট পরিশোধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ‘অ্যাডভান্স এগেইনস্ট পারচেজ অ্যান্ড এক্সপেন্স’সহ বিভিন্ন খাতে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করা বা কর্তন করা হলেও সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৭৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৬৭ টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আকিজ গ্রুপের চেয়ারম্যান এস কে নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্য চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ জসিম উদ্দিনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আকিজ রিসোর্ট ও আকিজ সিমেন্টের চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার তৌফিক হাসান জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানাতে হবে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক সদস্য বলেন, আইন অনুযায়ী রেয়াত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আকিজ সিমেন্টের ক্ষেত্রে রেয়াত গ্রহণে অনিয়ম হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে; এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জরুরি।