জাল দলিলের মাধ্যমে সরকারি খাস ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত গেজেটভুক্ত জমি নামজারি (খারিজ) করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক প্রবীণ গৃহস্থের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌর এলাকার হুজরাপুর গ্রামের মো. লোকমান আলীর ছেলে মো. ইসহাক আলীর (সাহেব) বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কোর্ট এলাকায় আদালত ভবনের একটি গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে ইসহাক আলী জমি নামজারি ও ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের মধ্যস্থতা করে আসছেন। ভুক্তভোগীর দাবি, একাধিক দফায় মোট তিন লাখ টাকা দেওয়ার পরও জমি নামজারি হয়নি। বরং টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো এবং পুলিশের ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন তিনি।
তবে অভিযুক্ত ইসহাক আলী টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির দলিল যাচাইয়ের পর সেটি জাল এবং ‘খ’ তফসিলভুক্ত সরকারি সম্পত্তি হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় নামজারি করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী মফিজুল ইসলামের অভিযোগ, শারীরিক অসুস্থতা ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে তাকে জমি নামজারি করে দেওয়ার কথা বলা হয়। ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা বক্তব্যে মফিজুল ইসলাম বলেন, তিনি নিজের নামও ভালোভাবে স্বাক্ষর করতে পারেন না। ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ায় একসময় তার হাঁটাচলা ও দৃষ্টিশক্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ সুযোগে ইসহাক আলী জমি খারিজ করে দেওয়ার কথা বলে তিন দফায় টাকা নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মফিজুলের দাবি, স্থানীয় ডিমের দোকানদারসহ অন্যদের সামনেও টাকা লেনদেন হয়েছে। পরে জমিটি নামজারি করা সম্ভব নয় জানিয়ে তাকে টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো পুলিশের ভয় দেখানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ইসহাক আলী (সাহেব) গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা বক্তব্যে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, মফিজুল ইসলামকে সরল বিশ্বাসে সহায়তা করার উদ্দেশ্যেই তিনি কাজটি করতে চেয়েছিলেন।
ইসহাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫০ নম্বর খতিয়ানের এক একর পাঁচ শতক জমির নামজারি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে এক একর ২০ শতক জমির যে দলিল দেওয়া হয়, সেটি কানুনগো পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ে জাল এবং ‘খ’ তফসিলভুক্ত সরকারি সম্পত্তি হিসেবে শনাক্ত হয়।
তার দাবি, জাল দলিলের ভিত্তিতে সরকারি জমি নামজারি করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার না করে তিনি দাবি করেন, “টাকার ভাগ তো সবাই নিয়েছে, কিন্তু কেউ কি এখন তা স্বীকার করবে?”
এই বক্তব্যের সত্যতা ও কথিত অর্থ ভাগাভাগির বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঝিলিম ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, মফিজুল ইসলামের নামে দুটি নামজারি আবেদন করা হয়েছিল। নথিপত্র ও সরেজমিন যাচাইয়ের পর একটি খতিয়ানের জমি সঠিক থাকায় সেটির নামজারির প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, অপর জমিটি ‘খ’ তফসিলভুক্ত গেজেটভুক্ত সরকারি সম্পত্তি হওয়ায় আইন অনুযায়ী সেটি নামজারি করার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
মাসুদ রানা আরও জানান, ইসহাক নামে এক যুবক মফিজুল ইসলামের হয়ে ভূমি অফিসে সুপারিশ করতে এসেছিলেন। তবে মফিজুল ইসলাম নিজে সরাসরি অফিসে যোগাযোগ করেননি।
সদর উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইকরামুল হক নাহিদ জানান, নামজারি প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়, কানুনগো এবং সর্বশেষ সহকারী কমিশনার (ভূমি) পর্যায়ে যাচাই-বাছাই ও শুনানি হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, আলোচ্য জমির ক্ষেত্রে কানুনগো পর্যায়ের যাচাইয়ে সরকারি স্বার্থ জড়িত থাকার বিষয়টি এবং দলিলের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ফলে নামজারির প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নামজারির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ১ হাজার ১৭০ টাকা। এর বাইরে কোনো অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই।
কেউ অফিসে কিংবা অফিসের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা গ্রহণ করলে ভুক্তভোগীকে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হবে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
একজন প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে সরকারি জমি নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে তিন লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে জাল দলিল, সরকারি খাস ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত জমি এবং ভূমি অফিসের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে টাকা লেনদেনের প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট জমির দলিল ও খতিয়ান, নামজারি আবেদনের নথি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ভূমি-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অর্থ আত্মসাৎ ও অন্যান্য অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।

















