তিবেদক:
প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ঢাকা ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড সঞ্চালন প্রকল্পে বাজারদর যাচাই না করেই বড় অঙ্কের চুক্তি করার অভিযোগ উঠেছে। কোনো দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়াই সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের আওতায় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পটিতে জনবল সংকট, আর্থিক অনিয়ম, ঠিকাদারের ব্যর্থতা, কারিগরি ঝুঁকি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির নানা চিত্র উঠে এসেছে।
প্রাক্কলন ছাড়াই ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকার চুক্তি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী দরপত্র আহ্বানের আগে বাজারদর যাচাই করে দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরি করা বাধ্যতামূলক। তবে এই প্রকল্পে তা না করেই সাতটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজে ২ হাজার ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চুক্তি করা হয়েছে।
আইএমইডি বলছে, দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করা সরাসরি সরকারি ক্রয় বিধিমালার লঙ্ঘন। এর ফলে প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এক প্যাকেজেই অতিরিক্ত ব্যয় ৫৪৮ কোটি টাকা
প্রকল্পের প্যাকেজ-৮-এর আওতায় উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজের চুক্তিমূল্য ছিল ৫২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনার্জিপ্যাক-সিএসইপিডিআই কনসোর্টিয়ামের ব্যর্থতার কারণে চুক্তি বাতিল করা হয়।
পরে একই কাজের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হলে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের চুক্তির তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১০৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৫৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই প্যাকেজের কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় প্যাকেজ-৪-এর আওতায় নির্মিত সঞ্চালন লাইনও চালু করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন সঞ্চালন লাইন চার্জ না করে ফেলে রাখলে সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরীক্ষা ছাড়াই ৪৬ কোটি টাকার বিল পরিশোধ
বিদ্যুৎ সঞ্চালন সরঞ্জামের মান যাচাইয়ের জন্য ‘ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট’ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকল্পে পরীক্ষা ছাড়াই ৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবেদনশীল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরীক্ষা ছাড়া গ্রিডে যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে যান্ত্রিক ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড বা বড় ধরনের কারিগরি বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২ কোটি ১৩ লাখ টাকার ড্রোন, নেই উড্ডয়ন অনুমতি
প্রকল্পে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রোন কেনা হলেও এর নিবন্ধন ও উড্ডয়ন অনুমোদন না থাকায় ব্যবহারে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত মালামাল আমদানি করে আরও ৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার বেশি অডিট আপত্তি
২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ২৫টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এসব আপত্তির আর্থিক পরিমাণ ২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ১২টি গুরুতর আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাস্তব ব্যয় এবং লোন ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন সিস্টেমে প্রদর্শিত ব্যয়ের মধ্যে ৮৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার গরমিল রয়েছে। নথিপত্র ছাড়া ৫৬ কোটি ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ছাড়, সুদ বাবদ ৩৮ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং বরাদ্দের চেয়ে ২৫ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ভ্যারিয়েশন অর্ডার ছাড়া ২০ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়, ভূমি অধিগ্রহণে সমন্বয়হীনভাবে ১৩ কোটি ৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয় এবং পরীক্ষা ছাড়া ট্রান্সফরমার অয়েল আমদানি ও বিল পরিশোধে ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার অনিয়মের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনবল সংকটে থমকে তদারকি
৫ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে অনুমোদিত ৮৭টি পদের মধ্যে ৫২টিই শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের প্রায় ৫৯ শতাংশ পদ খালি। ফলে প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের তদারকি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রকল্পটির অর্থায়নে সরকার দিচ্ছে ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ দিচ্ছে ৪ হাজার ২১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করবে ৩২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
সময়ে কাজ শেষ হয়নি, অগ্রগতি ৬১ শতাংশ
২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নকাল নির্ধারিত ছিল। তবে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
আইএমইডির হিসাবে, চলতি বছরের মে পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল ৭৮ শতাংশ। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৬১ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই সময়ে মোট বরাদ্দের মাত্র ৫৫ দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্প শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত চারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা ব্যাহত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে জমি ও কারিগরি জটিলতা
নীলফামারীর ডোমার উপকেন্দ্রের জমি নিয়ে স্থানীয়দের মামলার কারণে ভূমি হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ‘রাইট অব ওয়ে’ জটিলতায় সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া উপকেন্দ্রের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও বালু ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রামপুরা-বসুন্ধরা আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল লাইনের কাজ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান টিবিইএ। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ করছে ভারতের লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো ও ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড। বাতিল হওয়া এনার্জিপ্যাক কনসোর্টিয়ামের কাজ পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদারকে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
প্রকল্পের ব্যয় ও সময় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তি সম্পাদন এবং কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া বিল পরিশোধের মতো অনিয়মের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ১২টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয় ও আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে।
দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছাড়া চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ফয়জুল কবির বলেন, “এ ধরনের কিছু হয়নি।” এর বেশি মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।





















