টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান। চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছানো যাচ্ছে না পর্যাপ্ত ত্রাণ। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী।
অন্যদিকে কক্সবাজারে টানা সাত দিনের বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। গত ৫ জুলাই থেকে শনিবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
চট্টগ্রামে লাখো মানুষ পানিবন্দি
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৬টি উপজেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, সাতটি উপজেলায় দুই লাখের বেশি পরিবারের ১০ লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন।
বাঁশখালী, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, সন্দ্বীপ, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। গ্রামীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের পূর্ব ইলশা, পশ্চিম ইলশা, মধ্য ইলশা, উত্তর ইলশা, রত্নপুর ও চাপাছড়িসহ অধিকাংশ এলাকা চার দিন ধরে পানির নিচে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা।
সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, তীব্র স্রোতের কারণে সাধারণ নৌকা দিয়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকরাও উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীও চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার বিজয়নগর, আকমল আলী রোড, নিউ মুরিং মাদ্রাসা, নারিকেলতলা ও নেভি হাসপাতাল গেট এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নৌবাহিনীর সদস্যরা পানিবন্দি মানুষের মাঝে দুই হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন।
সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষতি
প্রাথমিক হিসাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার এবং এলজিইডির আওতায় ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে।
রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের শিলক খালের ওপর নির্মিত ব্রিজঘাট বেইলি সেতু পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ধসে পড়ায় রাঙ্গুনিয়া-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
পানিতে ডুবে আরও শিশুর মৃত্যু
সাতকানিয়ার দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে ইসমাইল হোসেন (২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।
কক্সবাজারে সাত দিনের দুর্ভোগ, মৃত্যু ২৬
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ৬৯টি ইউনিয়ন কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় আড়াই লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি।
টানা সাত দিনে ৭২০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নতুন করে পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের রামুর চাইন্দা এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
রাঙামাটি, বান্দরবান ও হবিগঞ্জেও দুর্ভোগ
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল ও রাজস্থলী উপজেলায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফসলি জমি, গবাদিপশুর খামার ও গোলাভরা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। রাজস্থলীতে বন্যার পানিতে আটটি গরুর মৃত্যু হয়েছে।
বান্দরবান জেলা শহর আবারও প্লাবিত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সাবস্টেশনের ট্রান্সফরমার পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জে নতুন করে আরও ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে লক্ষাধিক মানুষ বিশুদ্ধ পানি সংকটসহ নানা দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাত নির্দেশনা
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সাত দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ফোকাল পারসন নিয়োগ, মেডিকেল টিম গঠন, জরুরি ওষুধ, ওআরএস, স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা এবং সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা।
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলা এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১৪, ১৫ ও ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি, আলিম, এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশজুড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ পার্বত্য এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের প্রয়োজন ছাড়া পাহাড়ের ঢাল ও নিম্নাঞ্চলে অবস্থান না করার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।



















