হটানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধিতে কক্সবাজার জেলার বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সোমবার দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও দেয়ালধসের ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আটজন, কক্সবাজার শহরের দরিয়ানগরে এক নারী, পেকুয়ায় পাহাড়ধসে এক শিশু এবং উখিয়ায় মাটির ঘরের দেয়াল ধসে আরও দুইজন রয়েছেন।
প্রাণহানি এড়াতে কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে সহস্রাধিক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার এবং সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আরও ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে পাহাড়ধস, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার সদর, ঈদগাঁও ও কুতুবদিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রামু ও চকরিয়ার অন্তত ১৪টি ইউনিয়ন।
টেকনাফ উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বহু গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে এবং অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়িও আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী জানান, ইউনিয়নের অন্তত ৪০০টি ঘরে পানি উঠেছে এবং মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মো. অনীক চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে টানা পাঁচ দিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একই কারণে সময়মতো টেকনাফে পৌঁছাতে না পারায় দুইজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। জেলা প্রশাসন তাদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সহযোগিতা চেয়েছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার পৌরসভার হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, বাজারঘাটা, কালুর দোকান, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল, বাস টার্মিনাল ও বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সড়কের কেয়াকাটা খালের ওপর নির্মিত একটি জরাজীর্ণ সেতু ধসে পড়ায় দুই ইউনিয়নের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বৃষ্টি কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিটি উপজেলায় মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, আগামী দুই দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রয়োজন ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় না যাওয়ার এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।




















