টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের আদি বাসিন্দা গারো সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ‘আচিক’ আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। একদিকে সংখ্যাগুরু বাংলা ভাষার প্রভাব, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও নিজস্ব বর্ণমালার চর্চা না থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এই প্রাচীন ভাষা।
ইউনেস্কোর তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় ৬ হাজার ৭০০ ভাষার মধ্যে ২ হাজার ৫৮০টি ভাষা বিলুপ্তির পথে, যার বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। গারোদের বর্ণমালা ‘থকবিরিম’ নিয়ে রয়েছে নানা পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক শোকগাঁথা। গবেষক বাধন আরেং ও স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের মতে, তিব্বত থেকে এই উপমহাদেশে আসার পথে ঐতিহাসিক যুদ্ধ বা প্রতিকূলতার কারণে তাদের লিখিত বর্ণমালার অমূল্য দলিল ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে মুখে মুখে আচিক ভাষার প্রচলন থাকলেও এর লিখিত রূপ প্রায় বিলুপ্ত।
মধুপুরের ৪৪টি গ্রামে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় এখন বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ (৬৪.৬১%) এবং গারোরা সংখ্যালঘু (৩৫.৩৯%)। স্থানীয় গারোদের ভাষ্যমতে:: গারো শিক্ষার্থীদের শৈশব থেকেই বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করতে হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য ঝোঁক বাড়ছে ইংরেজির দিকে।
: অফিস-আদালত ও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বাংলার ব্যবহার অনিবার্য হওয়ায় নিজ মাতৃভাষার চর্চা কমে গেছে।
: ২০০৮ সালে ১২টি আদিবাসী প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হলেও দাতা সংস্থার অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ সেগুলো আর টিকিয়ে রাখতে পারেনি।
জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকেরক জানান, আগে শালবনে গারোরা কেবল আচিক ভাষায় কথা বলতেন। এখন পারিবারিকভাবেও এই ভাষার ব্যবহার কমছে। দাতা সংস্থার সহায়তা ছাড়া প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে, টাঙ্গাইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. হারুনর রশিদ বলেন, “সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই সরবরাহ ও পাঠদান কার্যক্রম চালু রেখেছে।”
তবে স্থানীয় সুধীজন ও ভাষা গবেষকদের মতে, সরকারি এই উদ্যোগের পাশাপাশি আদিবাসী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত বিদ্যালয় এবং নিয়মিত ভাষাচর্চার কেন্দ্র গড়ে না তুললে অদূর ভবিষ্যতে ‘আচিক’ কেবল ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে।




















