০৭:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

ভোলায় সমাজসেবা প্রশিক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ, স্বজনপ্রীতি-ঘুষ বাণিজ্যে তোলপাড়

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৭:৩৭:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৮

ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’-এর আওতায় আয়োজিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকে ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনে আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রশিক্ষণ শেষে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ এবং মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণের বিপরীতে জনপ্রতি ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি সহায়তা দেওয়াকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির আওতায় বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ড্রেস মেকিং, টেইলারিং ও বিউটিফিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হেয়ার কাটিং, হস্তশিল্প, বেসিক ডাইভিং, মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ ও এসি সার্ভিসিংসহ বিভিন্ন ট্রেডে মোট ১১৩ জন আবেদন করেন। পরে ১১ জুন মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ট্রেডে ২৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। ১৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে দৈনিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা এবং ৫০ হাজার টাকার চেকসহ মোট ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়।

তবে অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিতদের অধিকাংশই ভোলা সদর উপজেলার নিতাই চন্দ্র দাস ও লালমোহন উপজেলার তপন কুমারের আত্মীয়স্বজন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞপ্তি যথাযথভাবে প্রচার না করায় অনেক প্রকৃত অনগ্রসর ব্যক্তি আবেদন করার সুযোগ পাননি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে, একটি প্রভাবশালী দালালচক্র প্রশিক্ষণে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এবং সরকারি অনুদানের টাকা পাওয়ার পর প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করেছে। এ ঘটনায় জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকারের নামও অভিযোগে এসেছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে পাওয়া একটি অডিও কথোপকথনে প্রশিক্ষণার্থী রত্না রানী ও তার স্বামী সজল দাবি করেন, প্রশিক্ষণ শেষে নিতাই চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। রত্না রানী জানান, তিনি তার মামা ধীরেন চন্দ্র দাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তাকেও টাকা দিতে বলা হয়েছিল।

দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের লেজপাতা গ্রামের প্রশিক্ষণার্থী মিঠুন চন্দ্র মণ্ডল অভিযোগ করেন, প্রশিক্ষণ শেষে কত টাকা পেয়েছেন বা কাউকে টাকা দিয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে কাউকে কিছু না বলতে সমাজসেবা অফিস ও এক আত্মীয় তাকে নিষেধ করেছিলেন।

অন্যদিকে লালমোহন উপজেলার সীমা রানী অভিযোগ করেন, সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলে তপন চন্দ্র তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের ভয়ে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তার দাবি, আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও একইভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে নিতাই চন্দ্র দাস বলেন, তার সংগঠন থেকে ১৮ জন আবেদন করলেও মাত্র ৬ জন সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচিতদের কেউ কেউ দূর সম্পর্কের আত্মীয় হলেও তিনি কোনো প্রভাব খাটাননি। ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে ধীরেন চন্দ্র দাস দাবি করেন, আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জন্য অফিসিয়াল ফি হিসেবে ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিতরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন।

এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার বলেন, “সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। উপজেলা ও শহর সমাজসেবা কার্যালয় এবং ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। অনিয়ম বা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয়।”

এদিকে সচেতন মহলের প্রশ্ন, মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের মতো বিষয়ে প্রকৃত দক্ষতা অর্জন কতটা সম্ভব। তারা এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

সর্বাধিক পঠিত

ভোলায় সমাজসেবা প্রশিক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ, স্বজনপ্রীতি-ঘুষ বাণিজ্যে তোলপাড়

ভোলায় সমাজসেবা প্রশিক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ, স্বজনপ্রীতি-ঘুষ বাণিজ্যে তোলপাড়

আপডেট: ০৭:৩৭:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’-এর আওতায় আয়োজিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকে ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনে আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রশিক্ষণ শেষে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ এবং মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণের বিপরীতে জনপ্রতি ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি সহায়তা দেওয়াকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির আওতায় বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ড্রেস মেকিং, টেইলারিং ও বিউটিফিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হেয়ার কাটিং, হস্তশিল্প, বেসিক ডাইভিং, মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ ও এসি সার্ভিসিংসহ বিভিন্ন ট্রেডে মোট ১১৩ জন আবেদন করেন। পরে ১১ জুন মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ট্রেডে ২৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। ১৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে দৈনিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা এবং ৫০ হাজার টাকার চেকসহ মোট ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়।

তবে অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিতদের অধিকাংশই ভোলা সদর উপজেলার নিতাই চন্দ্র দাস ও লালমোহন উপজেলার তপন কুমারের আত্মীয়স্বজন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞপ্তি যথাযথভাবে প্রচার না করায় অনেক প্রকৃত অনগ্রসর ব্যক্তি আবেদন করার সুযোগ পাননি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে, একটি প্রভাবশালী দালালচক্র প্রশিক্ষণে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এবং সরকারি অনুদানের টাকা পাওয়ার পর প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করেছে। এ ঘটনায় জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকারের নামও অভিযোগে এসেছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে পাওয়া একটি অডিও কথোপকথনে প্রশিক্ষণার্থী রত্না রানী ও তার স্বামী সজল দাবি করেন, প্রশিক্ষণ শেষে নিতাই চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। রত্না রানী জানান, তিনি তার মামা ধীরেন চন্দ্র দাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তাকেও টাকা দিতে বলা হয়েছিল।

দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের লেজপাতা গ্রামের প্রশিক্ষণার্থী মিঠুন চন্দ্র মণ্ডল অভিযোগ করেন, প্রশিক্ষণ শেষে কত টাকা পেয়েছেন বা কাউকে টাকা দিয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে কাউকে কিছু না বলতে সমাজসেবা অফিস ও এক আত্মীয় তাকে নিষেধ করেছিলেন।

অন্যদিকে লালমোহন উপজেলার সীমা রানী অভিযোগ করেন, সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলে তপন চন্দ্র তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের ভয়ে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তার দাবি, আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও একইভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে নিতাই চন্দ্র দাস বলেন, তার সংগঠন থেকে ১৮ জন আবেদন করলেও মাত্র ৬ জন সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচিতদের কেউ কেউ দূর সম্পর্কের আত্মীয় হলেও তিনি কোনো প্রভাব খাটাননি। ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে ধীরেন চন্দ্র দাস দাবি করেন, আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জন্য অফিসিয়াল ফি হিসেবে ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিতরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন।

এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার বলেন, “সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। উপজেলা ও শহর সমাজসেবা কার্যালয় এবং ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। অনিয়ম বা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয়।”

এদিকে সচেতন মহলের প্রশ্ন, মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের মতো বিষয়ে প্রকৃত দক্ষতা অর্জন কতটা সম্ভব। তারা এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।