০১:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

৮ দিনের বন্যায় কক্সবাজারের ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত, প্রাণহানি ৩২

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১২:১৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • ৫১০

টানা আট দিনের ভারী বর্ষণের পর কক্সবাজারে প্লাবিত এলাকার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। রোববার (১৩ জুলাই) রাত থেকে ভারী বৃষ্টি বন্ধ থাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন বন্যার প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রাণহানি থেকে শুরু করে কৃষি, মৎস্য, বসতবাড়ি, সড়ক ও বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত নয় দিনে জেলায় মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৪ মিলিমিটার

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায় এবং আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে উখিয়া উপজেলায়, যেখানে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ ১৪ জন মারা গেছেন। এছাড়া চকরিয়ায় ছয়জন, কক্সবাজার সদরে তিনজন, রামুতে তিনজন, পেকুয়ায় দুজন এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে নিহত হয়েছেন।

বন্যায় জেলার ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া উপজেলায়, যেখানে ৪৫০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর, ৪৫৩টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এক হাজার ৯৭ টন মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি, কোটি কোটি মাছ ও চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন সবজিসহ ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার ৩৮০ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪৪টি স্থানে ক্ষতি হয়েছে। চকরিয়ার কোনাখালী এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক, ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট এবং ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যাকবলিত মানুষের জন্য জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গতদের মধ্যে ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বিশেষ করে সুপেয় পানি ও খাদ্যসংকট সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে বানভাসি মানুষকে।

সোমবার রাতে জেলা প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের পাশে সরকার রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের আওতায় এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কোথাও কোথাও ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লাগছে। তবে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়।

সর্বাধিক পঠিত

চাঁদপুরে সাবেক নারী ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

৮ দিনের বন্যায় কক্সবাজারের ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত, প্রাণহানি ৩২

আপডেট: ১২:১৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

টানা আট দিনের ভারী বর্ষণের পর কক্সবাজারে প্লাবিত এলাকার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। রোববার (১৩ জুলাই) রাত থেকে ভারী বৃষ্টি বন্ধ থাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন বন্যার প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রাণহানি থেকে শুরু করে কৃষি, মৎস্য, বসতবাড়ি, সড়ক ও বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত নয় দিনে জেলায় মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৪ মিলিমিটার

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায় এবং আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে উখিয়া উপজেলায়, যেখানে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ ১৪ জন মারা গেছেন। এছাড়া চকরিয়ায় ছয়জন, কক্সবাজার সদরে তিনজন, রামুতে তিনজন, পেকুয়ায় দুজন এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে নিহত হয়েছেন।

বন্যায় জেলার ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া উপজেলায়, যেখানে ৪৫০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর, ৪৫৩টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এক হাজার ৯৭ টন মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি, কোটি কোটি মাছ ও চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন সবজিসহ ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার ৩৮০ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪৪টি স্থানে ক্ষতি হয়েছে। চকরিয়ার কোনাখালী এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক, ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট এবং ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যাকবলিত মানুষের জন্য জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গতদের মধ্যে ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বিশেষ করে সুপেয় পানি ও খাদ্যসংকট সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে বানভাসি মানুষকে।

সোমবার রাতে জেলা প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের পাশে সরকার রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের আওতায় এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কোথাও কোথাও ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লাগছে। তবে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়।