যশোর শহরের আকাশছোঁয়া অভিজাত ‘জাবির হোটেল’। ছন্নছাড়া জীবনে অভাব আর বঞ্চনা যাদের নিত্যসঙ্গী, সেইসব পথশিশুদের কাছে এই ভবনটি যেন এক বিস্ময়। তেমনই এক বিস্ময় নিয়ে এই হোটেলের ছাদে গিয়ে একটু শুয়ে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল সাত বছরের শিশু মনিরুল (ছদ্মনাম)। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে চোর সন্দেহে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে ও তার তিন বন্ধুকে।
মনিরুল আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতো নয়। বাবা-মা দুজনেই আলাদা সংসার করায় ঠাঁই হয়েছে রাজপথে। যশোর শহরের রেল স্টেশন, হাসপাতাল চত্বর বা ফুটপাতই তার ঠিকানা। মনিরুলের দীর্ঘদিনের ইচ্ছে ছিল শহরের সবচাইতে উঁচু ভবন জাবির হোটেলের ছাদে উঠবে, সেখানে গিয়ে শুয়ে থাকবে।
সেই কৌতূহল মেটাতে মঙ্গলবার দুপুরে আরও তিন বন্ধুকে নিয়ে কৌশলে হোটেলের ছাদে উঠে পড়ে সে। সারাদিন সেখানে কাটানোর পর সন্ধ্যায় যখন তারা নিচে নামার চেষ্টা করে, তখনই বাধে বিপত্তি।
পাশ্ববর্তী ম্যাগপাই হোটেলের ম্যানেজার রাজু বিশ্বাস জানান, জাবির হোটেলের দেয়াল ঘেঁষে প্রায়ই চোরেরা ভেতরে ঢুকে গ্রিল বা এসির মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় শিশুদের নামতে দেখে সন্দেহ হওয়ায় স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।
সংবাদ পেয়ে কসবা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আবু বক্কর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পুলিশ শিশুদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে বেরিয়ে আসে এক মর্মস্পর্শী সত্য। শিশুরা জানায়, কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নয়, বরং কেবল কৌতূহল মেটাতে এবং হোটেলের ছাদে সময় কাটানোর তীব্র ইচ্ছা থেকেই তারা সেখানে উঠেছিল। তাদের সরল স্বীকারোক্তি ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে পরে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।
এই ঘটনাটি যেমন পথশিশুদের অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প বলে, তেমনি স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে তৈরি করেছে উদ্বেগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, জাবির হোটেল সংলগ্ন ফাঁকা জায়গাগুলো সন্ধ্যার পর বখাটে ও মাদকাসক্তদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। পথশিশুদের একটি অংশকে ব্যবহার করে সেখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মনিরুলের মতো শিশুদের এই বেপরোয়া কৌতূহল আসলে তাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতারই প্রতিফলন। সঠিক পুনর্বাসন ও তদারকি না থাকলে এই কোমলমতি শিশুরাই এক সময় বড় কোনো অপরাধের শিকারে পরিণত হতে পারে।











