১০:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মুখে শেখ হাসিনাকে কেন বাংলাদেশে ফেরত দেবে না ভারত? আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৩:১৩:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫
  • ৫৭০

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় তাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। শেখ হাসিনাকে বারবার ফেরত পাঠানোর অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত কেন তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে না, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা ও ন্যায়বিচারের অনুভূতি
গত সোমবার (নভেম্বর ১৯, ২০২৫) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। একই মামলায় পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে আদালত শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সীমা আখতার, যিনি গত বছর বিক্ষোভে বন্ধু হারিয়েছেন, আল-জাজিরাকে জানান, “ফ্যাসিবাদী হাসিনা ভেবেছিলেন, তাকে কখনও পরাজিত করা যাবে না। তার মৃত্যুদণ্ড আমাদের শহীদদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি পদক্ষেপ।” তবে সীমা আখতার মনে করেন, “আমরা দেখতে চাই, তাকে এই ঢাকাতেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।”
নয়াদিল্লির অবস্থান: মৃত্যুদণ্ডের মুখে ফেরত অসম্ভব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং তখন থেকেই তিনি নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন।
এই রায় ঘোষণার পর, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ আরও জোরালো হলেও, ভারত তাকে ফিরিয়ে দেবে কি না— তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নয়াদিল্লি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে— এমন দৃশ্য তারা কল্পনাও করতে পারছেন না। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী আল-জাজিরাকে প্রশ্ন করেছেন, “নয়াদিল্লি কীভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে?”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত শেখ হাসিনা-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হলেও, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো নৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে কঠিন হবে। এটি ১৫ মাস ধরে দুই দেশের উত্তেজনার একটি প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে এবং এই রায়ের পর উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।যেভাবে পতন হলো
জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে শেখ হাসিনা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় (টানা ১৫ বছর) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যায়।
তবে এই সময়ে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ ওঠে। তার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো বিরোধী দল বর্জন করেছিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়নের পর সেই বিক্ষোভ ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান।
অন্তর্বর্তী সরকার ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়াসহ একাধিক ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা চলার মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

সর্বাধিক পঠিত

বেনাপোলে সোনা, ডলার ও ওষুধ চোরাচালানের ‘ডন’ ইকরামুলের বিরুদ্ধে বিজিবির মামলা

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মুখে শেখ হাসিনাকে কেন বাংলাদেশে ফেরত দেবে না ভারত? আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

আপডেট: ০৩:১৩:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় তাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। শেখ হাসিনাকে বারবার ফেরত পাঠানোর অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত কেন তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে না, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা ও ন্যায়বিচারের অনুভূতি
গত সোমবার (নভেম্বর ১৯, ২০২৫) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। একই মামলায় পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে আদালত শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সীমা আখতার, যিনি গত বছর বিক্ষোভে বন্ধু হারিয়েছেন, আল-জাজিরাকে জানান, “ফ্যাসিবাদী হাসিনা ভেবেছিলেন, তাকে কখনও পরাজিত করা যাবে না। তার মৃত্যুদণ্ড আমাদের শহীদদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি পদক্ষেপ।” তবে সীমা আখতার মনে করেন, “আমরা দেখতে চাই, তাকে এই ঢাকাতেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।”
নয়াদিল্লির অবস্থান: মৃত্যুদণ্ডের মুখে ফেরত অসম্ভব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং তখন থেকেই তিনি নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন।
এই রায় ঘোষণার পর, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ আরও জোরালো হলেও, ভারত তাকে ফিরিয়ে দেবে কি না— তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নয়াদিল্লি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে— এমন দৃশ্য তারা কল্পনাও করতে পারছেন না। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী আল-জাজিরাকে প্রশ্ন করেছেন, “নয়াদিল্লি কীভাবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে?”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত শেখ হাসিনা-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হলেও, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো নৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে কঠিন হবে। এটি ১৫ মাস ধরে দুই দেশের উত্তেজনার একটি প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে এবং এই রায়ের পর উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।যেভাবে পতন হলো
জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে শেখ হাসিনা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় (টানা ১৫ বছর) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যায়।
তবে এই সময়ে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ ওঠে। তার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো বিরোধী দল বর্জন করেছিল বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়নের পর সেই বিক্ষোভ ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান।
অন্তর্বর্তী সরকার ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়াসহ একাধিক ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা চলার মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।