ভারতের শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন’স নেক’ অঞ্চলে সম্প্রতি ভারতীয় সেনাবাহিনীর নতুন গ্যারিসন স্থাপন এবং বড় আকারের সেনাসমাবেশ লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম নিম্নতম পর্যায়ে রয়েছে।
ডি ডব্লিউর একটি প্রতিবেদনে এই সামরিক তৎপরতা এবং এর পেছনে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
শেখ হাসিনার আশ্রয় এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়: জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে।
* বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশে ফেরাতে ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ কার্যকর করার প্রস্তুতি নিলেও ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়, যা উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
* বাংলাদেশের নতুন সরকারের অবস্থান: নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতকে আগের মতো ঘনিষ্ঠভাবে দেখছে না—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
* ভারতবিরোধী মনোভাব: নয়াদিল্লির থিংকট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রধান হর্ষ ভি. পন্তের মতে, বাংলাদেশে বাড়তে থাকা ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ড. ইউনূস সরকারের ভারতবিরোধী অবস্থানের ইঙ্গিত নয়াদিল্লিকে সতর্ক করেছে।
* ড. ইউনূসের মন্তব্য: ড. ইউনূস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে স্থলবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড) উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাদের সাগরে প্রবেশের একমাত্র প্রবেশদ্বার বাংলাদেশ। যদিও ঢাকা এটিকে আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা হিসেবে দাবি করেছে, তবে নয়াদিল্লি এই মন্তব্যকে ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে ভালোভাবে নেয়নি।
ভারতের সামরিক তৎপরতা
শিলিগুড়ি করিডরের চারপাশে তিনটি নতুন পূর্ণাঙ্গ গ্যারিসন স্থাপন এবং সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সেনাসমাবেশ করা হয়েছে।
বিশাল সামরিক মহড়া: ভারতীয় বিমানবাহিনী ৯ নভেম্বর আসামে বৃহৎ এয়ার শো এবং এরপর ১৩ থেকে ২০ নভেম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাত দিনব্যাপী বড়সড় মহড়া চালায়।
* কৌশলগত দুর্বলতা: হর্ষ ভি. পন্ত শিলিগুড়ি করিডরকে ভারতের একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যাকে সুরক্ষিত রাখা অপরিহার্য। সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্য মনে করেন, এগুলি কখনো নিয়মিত মহড়া, আবার কখনো বার্তা দেওয়ার কৌশল হতে পারে।
পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কের উষ্ণতা
* ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানের একটি যুদ্ধজাহাজ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে নোঙর করেছে এবং পাকিস্তানের নৌবাহিনীর প্রধান ঢাকা সফর করেছেন।
* বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব কাটাতে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ইসলামাবাদ ঢাকায় উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল পাঠানো, নতুন বাণিজ্য চুক্তি করা এবং সামরিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় হয়েছে।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবিরের মতে, ১৫ বছর ধরে ভারত ভেবেছে, ঢাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে—এ যুগ শেষ। তিনি মনে করেন, সম্পর্কের জন্য পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও মর্যাদা প্রয়োজন, যা ভারতের আচরণে দেখা যাচ্ছে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক জেনারেল ফজলে ইলাহী আকবর বলেছেন, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে ভারতের ভূমিকাকে স্বীকার করবে, কিন্তু নিজের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারতকে খুশি করা অব্যাহত রাখবে না।
বর্তমান পরিস্থিতি
ভারত সম্ভবত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করাচ্ছে, অর্থাৎ নির্বাচিত সরকার এলেই পূর্ণমাত্রায় সম্পর্ক পুনর্গঠিত হবে।
চলমান উত্তেজনার মধ্যে ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে অংশ নিতে নয়াদিল্লি সফর করছেন। সেখানে তাঁর ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।




















