জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঢাকা কর অঞ্চল-৩-এর অতিরিক্ত কমিশনার মো. মুরাদ আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, করদাতাদের সঙ্গে গোপন আঁতাত এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বিলাসবহুল বাড়ির মালিকানা এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এনবিআরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম ও কর ফাঁকিতে সহযোগিতার কারণে প্রতিবছর সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষায় প্রশাসনিক দুর্বলতা ও কর ফাঁকির কারণে বিপুল রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মধ্যে করপোরেট ও আয়কর খাতের অনিয়মও অন্যতম বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার অভিযোগ
চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর মরহুম মমতাজ উদ্দিনের ছেলে মো. মুরাদ আহমেদ ২০০৫ সালে ২৪তম বিসিএস (কর) ক্যাডারে যোগ দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন।
যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে পরিদর্শী রেঞ্জ-৪, কর অঞ্চল-১৪ এবং পরবর্তীতে কর অঞ্চল-১৫-এ দায়িত্ব পালনকালে করদাতাদের হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে তাকে পরিদর্শী রেঞ্জ-৩, কর অঞ্চল-৪-এ বদলি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বদলিতে তার দায়িত্বের ধরনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। দীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সাময়িক বরখাস্ত ও শাস্তি মওকুফের ঘটনা
২০২৫ সালের জুলাইয়ে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের সময় বদলি আদেশ ছিঁড়ে ফেলা ও অসদাচরণের অভিযোগে মুরাদ আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বেতন গ্রেড তিন ধাপ অবনমিত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশনায় সাবেক রাষ্ট্রপতির আদেশে এনবিআরের ২০ কর্মকর্তার পূর্ববর্তী শাস্তি মওকুফ করা হয়, যাদের মধ্যে মুরাদ আহমেদও ছিলেন।
এরপর একই বছরের আগস্টে কর অঞ্চল যশোরে কর্মরত থাকা অবস্থায় তদবির ও অবৈধ অর্থের মাধ্যমে তিনি পুনরায় ঢাকা কর অঞ্চল-৩-এ বদলি হয়ে আসেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট, ভাইয়ের নামে বিলাসবহুল গাড়ি
মুরাদ আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ৩/২১ নম্বর ভবনের সপ্তম তলার এ ব্লকে তার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। ফ্ল্যাট মালিকদের তালিকায় তার নাম রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে তার একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ি থাকার অভিযোগ উঠেছে।
প্রায় কোটি টাকা মূল্যের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৪০১১) নিজের নামে নিবন্ধন না করে ছোট ভাই মুনতাসির আহমেদের নামে নিবন্ধন করিয়ে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ রাখার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিলাসী জীবনযাপন করছেন মুরাদ আহমেদ। তার একজন ব্যক্তিগত চালক রয়েছেন, যার পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যয়বহুল ভ্রমণের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া তার স্ত্রী মাহমুদা রশীদ, দুই ছেলে মাশরুর আহমেদ ও মাহফুজ আহমেদসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ কেনার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, মুরাদ আহমেদের পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোর নথিপত্র পর্যালোচনা ও আর্থিক লেনদেন তদন্ত করা হলে আরও অনিয়মের তথ্য সামনে আসতে পারে।
তাদের মতে, রাজস্ব প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। এতে কর আদায় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে টানা ১৫ দিন মুরাদ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সরাসরি সাক্ষাতের অনুরোধেও সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়কে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা জরুরি।




















