১১:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকে ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ, সাবেক ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:৪৯:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫০৩

আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের চৌদ্দগ্রাম শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ, চেক জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে দুই সহযোগী কর্মকর্তাসহ ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২৩৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল বলে দাপ্তরিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরও ২০২৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকজন গ্রাহকের আমানতের টাকা আত্মসাতের নতুন অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকিং খাত ও স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যাংক সূত্র ও দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, সরওয়ার আলম তালুকদার ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৯ জুন পর্যন্ত চৌদ্দগ্রাম শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ, জামানতের চেকে স্বাক্ষর জালিয়াতি, ভুয়া ঋণের নামে টাকা উত্তোলন এবং স্ত্রী ও স্বজনদের নিয়মবহির্ভূত ঋণ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

নথিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সরওয়ার আলম তালুকদার এবং তাঁর দুই সহযোগী কর্মকর্তা আবদুল জলিল ও আবুল কালামের বিরুদ্ধে মোট ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২৩৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুই বছরের বেতনবৃদ্ধি স্থগিতের মাধ্যমে বিভাগীয় মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে ১৭টি অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—অধীনস্থ এক কর্মকর্তার চেকে স্বাক্ষর জাল করে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬৬ টাকা উত্তোলন, আমানতকারীদের কাছ থেকে ৯ লাখ ৮ হাজার ৩০০ টাকা আত্মসাৎ, এসডিপিএসের রসিদ পরিবর্তন করে ২৫ হাজার টাকা এবং এসডিপিএসের স্থিতি পরিশোধের ২ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ টাকা আত্মসাৎ।

এ ছাড়া ভুয়া ঋণের নামে ২ লাখ টাকা আত্মসাৎ, স্ত্রী রুনা লায়লার নামে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ৬৩ হাজার ৬৩০ টাকা অতিরিক্ত ঋণ প্রদান এবং প্রধান কার্যালয় থেকে নামঞ্জুর করা এক উদ্যোক্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে।

নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, জমা ছাড়াই জমা-উত্তোলনের হিসাব দেখিয়ে ৩ লাখ টাকা তসরুপ এবং গ্রাহকের মাসিক কিস্তির ৮৩ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছিল।

নতুন করে তিন গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

পুরোনো অভিযোগের পর ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে নতুন করে গ্রাহকের আমানত আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পারভীন আক্তারের ৫ হাজার ১৫৬ টাকা, পারভীন বেগমের ৩৮ হাজার ৪০৯ টাকা এবং আবুল খায়েরের ৩২ হাজার ৫১৭ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো জানা যায়নি।

ভুক্তভোগী গ্রাহক সোহেল আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২১ সালে ঋণ নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে জমা দেওয়া চেকে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। তাঁর দাবি, তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলেও অতিরিক্ত ঋণের বোঝা ও সুদের দায় এখনো তাঁকেই বহন করতে হচ্ছে। প্রতিবাদ করায় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রহিমা বেগম নামের আরেক গ্রাহক জানান, তিনি ও তাঁর প্রয়াত স্বামী পৃথক হিসাবে মোট ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্বাক্ষর জাল করে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ তুলে আত্মসাৎ করা হয় বলে তাঁর অভিযোগ। ২০২৪ সালের জুনে তাঁর স্বামী মারা গেলেও ওই ঋণের দায় এখনো তাঁদের পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া প্রবাসী শফিউল আজম ও আবুল খায়ের এসডিপিএসের বকেয়া এবং আমানতের টাকা ফেরত না পেয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চৌদ্দগ্রাম শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক নাছির উদ্দিন জানান, সাবেক ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালনকালে এসডিপিএসের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি চারজন গ্রাহক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ব্যাংকটির কুমিল্লা অঞ্চলের আবাসিক ব্যবস্থাপক (আরএমও) জামাল উদ্দিন বলেন, নতুন অভিযোগের লিখিত কাগজপত্র এখনো তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী তদন্ত করা হবে।

আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন জানান, তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করায় বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে পরে বক্তব্য দেবেন।

অভিযোগ অস্বীকার সাবেক ব্যবস্থাপকের

তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নতুন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন সরওয়ার আলম তালুকদার। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে নতুন করে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আর পূর্বের প্রদেয় শাস্তির বিষয়ে আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করেছি।”

গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে নতুন করে তদন্ত এবং আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।

সর্বাধিক পঠিত

সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার, ৫ আগস্টের ভিডিও ঘিরে নানা প্রশ্ন

আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকে ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ, সাবেক ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

আপডেট: ১০:৪৯:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের চৌদ্দগ্রাম শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ, চেক জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে দুই সহযোগী কর্মকর্তাসহ ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২৩৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল বলে দাপ্তরিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরও ২০২৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকজন গ্রাহকের আমানতের টাকা আত্মসাতের নতুন অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকিং খাত ও স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যাংক সূত্র ও দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, সরওয়ার আলম তালুকদার ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৯ জুন পর্যন্ত চৌদ্দগ্রাম শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ, জামানতের চেকে স্বাক্ষর জালিয়াতি, ভুয়া ঋণের নামে টাকা উত্তোলন এবং স্ত্রী ও স্বজনদের নিয়মবহির্ভূত ঋণ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

নথিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সরওয়ার আলম তালুকদার এবং তাঁর দুই সহযোগী কর্মকর্তা আবদুল জলিল ও আবুল কালামের বিরুদ্ধে মোট ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২৩৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুই বছরের বেতনবৃদ্ধি স্থগিতের মাধ্যমে বিভাগীয় মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে ১৭টি অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—অধীনস্থ এক কর্মকর্তার চেকে স্বাক্ষর জাল করে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬৬ টাকা উত্তোলন, আমানতকারীদের কাছ থেকে ৯ লাখ ৮ হাজার ৩০০ টাকা আত্মসাৎ, এসডিপিএসের রসিদ পরিবর্তন করে ২৫ হাজার টাকা এবং এসডিপিএসের স্থিতি পরিশোধের ২ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ টাকা আত্মসাৎ।

এ ছাড়া ভুয়া ঋণের নামে ২ লাখ টাকা আত্মসাৎ, স্ত্রী রুনা লায়লার নামে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ৬৩ হাজার ৬৩০ টাকা অতিরিক্ত ঋণ প্রদান এবং প্রধান কার্যালয় থেকে নামঞ্জুর করা এক উদ্যোক্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে।

নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, জমা ছাড়াই জমা-উত্তোলনের হিসাব দেখিয়ে ৩ লাখ টাকা তসরুপ এবং গ্রাহকের মাসিক কিস্তির ৮৩ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছিল।

নতুন করে তিন গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

পুরোনো অভিযোগের পর ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে নতুন করে গ্রাহকের আমানত আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পারভীন আক্তারের ৫ হাজার ১৫৬ টাকা, পারভীন বেগমের ৩৮ হাজার ৪০৯ টাকা এবং আবুল খায়েরের ৩২ হাজার ৫১৭ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো জানা যায়নি।

ভুক্তভোগী গ্রাহক সোহেল আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২১ সালে ঋণ নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে জমা দেওয়া চেকে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। তাঁর দাবি, তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলেও অতিরিক্ত ঋণের বোঝা ও সুদের দায় এখনো তাঁকেই বহন করতে হচ্ছে। প্রতিবাদ করায় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রহিমা বেগম নামের আরেক গ্রাহক জানান, তিনি ও তাঁর প্রয়াত স্বামী পৃথক হিসাবে মোট ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্বাক্ষর জাল করে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ তুলে আত্মসাৎ করা হয় বলে তাঁর অভিযোগ। ২০২৪ সালের জুনে তাঁর স্বামী মারা গেলেও ওই ঋণের দায় এখনো তাঁদের পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া প্রবাসী শফিউল আজম ও আবুল খায়ের এসডিপিএসের বকেয়া এবং আমানতের টাকা ফেরত না পেয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চৌদ্দগ্রাম শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক নাছির উদ্দিন জানান, সাবেক ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালনকালে এসডিপিএসের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি চারজন গ্রাহক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ব্যাংকটির কুমিল্লা অঞ্চলের আবাসিক ব্যবস্থাপক (আরএমও) জামাল উদ্দিন বলেন, নতুন অভিযোগের লিখিত কাগজপত্র এখনো তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী তদন্ত করা হবে।

আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন জানান, তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করায় বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে পরে বক্তব্য দেবেন।

অভিযোগ অস্বীকার সাবেক ব্যবস্থাপকের

তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নতুন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন সরওয়ার আলম তালুকদার। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে নতুন করে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আর পূর্বের প্রদেয় শাস্তির বিষয়ে আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করেছি।”

গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে নতুন করে তদন্ত এবং আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।