অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের সেবায় নিয়োজিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিন।
অভিযোগকারীদের দাবি, লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্ট অনুমোদন, সরকারি কেনাকাটা, বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অভিযোগগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কথিত ঘুষের অর্থের হিসাব সরাসরি টাকার অঙ্কে না লিখে সাংকেতিক কোড ব্যবহার করে একটি ডায়েরিতে সংরক্ষণের বিষয়টি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সংগৃহীত অর্থের হিসাব মেলানোর পর এর একটি বড় অংশ ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হতো।
অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত অবৈধ অর্থ লেনদেনের হিসাব গোপন রাখতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। সরাসরি টাকার অঙ্ক উল্লেখ না করে বিভিন্ন সাংকেতিক কোডের মাধ্যমে একটি ডায়েরিতে হিসাব লেখা হতো। প্রতিটি কোডের বিপরীতে আনুমানিক ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডায়েরিটি উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে পরিচিত জাকিরের কাছে সংরক্ষিত থাকত বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত অর্থের হিসাব দিন শেষে কোডের সঙ্গে মিলিয়ে নিষ্পত্তি করা হতো। পরে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে গাড়িতে করে সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ তেজগাঁও এলাকায় ছালেহ উদ্দিনের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে কথিত ডায়েরির অস্তিত্ব, এর বিষয়বস্তু কিংবা অর্থ লেনদেনের দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফায়ার লাইসেন্স প্রদান ও ফায়ার রিপোর্ট অনুমোদনকে কেন্দ্র করে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর সংযোজনের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ফায়ার রিপোর্টের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, দাবি করা অর্থ না পেলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র আটকে রাখা হয় কিংবা রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে বিলম্ব করা হয়। এতে সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তির পাশাপাশি ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এক অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিক লেনদেন হয়। তবে এই অর্থের পরিমাণ বা লেনদেনের ব্যাপকতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মো. ছালেহ উদ্দিনের পদোন্নতি এবং ঢাকা বিভাগে পদায়ন নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, পদোন্নতির আগে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁর বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ ছিল। পাশাপাশি ঢাকা বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের তদবির এবং বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া বদলি ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত নুর উদ্দিন আনিস এবং সহকারী পরিচালক আনিসের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব দাবির পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন।
অভিযোগপত্রে ছালেহ উদ্দিনের দায়িত্বকালে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার সরকারি কেনাকাটায় অনিয়মের দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্টেশনারি ও গাড়ির পাম্পসংক্রান্ত ব্যয় অন্য খাতে দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে আসবাবপত্র কেনার খাত ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিভাগের কয়েকটি ফায়ার স্টেশনে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যানবাহনের নিবন্ধন এবং কর্মচারীদের খাবারের বিল বকেয়া পড়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে স্টেশনগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বারিধারা ফায়ার স্টেশনের জ্বালানি বিল বকেয়া থাকায় স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতি সত্য হলে তা জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতা ও জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে।
অধীনস্থ সিনিয়র স্টেশন অফিসার ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টরদের (ডিএডি) কাছ থেকে নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত মাসোহারা পরিশোধে অনীহা দেখালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি আটকে দেওয়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
সম্প্রতি সিনিয়র স্টেশন অফিসারদের সাপ্তাহিক ছুটি মঞ্জুর না করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভাগে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ছুটি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক কারণ এবং এর সঙ্গে অর্থ লেনদেনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য দিতে রাজি হননি বলে জানানো হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য না পাওয়ায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং নথিপত্রের তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি বা প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্ট অনুমোদন, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে তা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
এ অবস্থায় কথিত ডায়েরি, লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টসংক্রান্ত নথি, সরকারি ক্রয়ের বিল-ভাউচার, বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ফায়ার স্টেশনগুলোর প্রশাসনিক রেকর্ড নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত পরিচালনা করা উচিত। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সে বিষয়টিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখতেও সহায়তা করবে।




















