নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত ১৭ তলা বাণিজ্যিক ভবন মিরপুর সিটি সেন্টার দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে জমির মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগে ভবনটিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় স্থাপন করে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। এতে দুটি ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে তারা।
মিরপুর-১ নম্বরে ৩০ কাঠা জমির ওপর তিনটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ভবনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও প্রতিকার মিলছে না।
জানা গেছে, ভবনটির জমির মালিক হায়দার আলী খান বহলুলসহ চারজন। তাঁদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে চুক্তি করে ভবন নির্মাণের দায়িত্ব নেয় এজি প্রপার্টিজ। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে কাজ শুরুর পর এজি প্রপার্টিজ জানতে পারে, জমির মালিকেরা অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও চুক্তি করেছেন। এজি প্রপার্টিজের অভিযোগ, তাদের সঙ্গে চুক্তির সময় বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জমির মালিকেরা এভাবে মোট তিনটি পক্ষের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। জমির মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মামলা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি এজি প্রপার্টিজ। এতে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির মধ্যেও ভবনটির নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে এজি প্রপার্টিজ। তিনটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবনের কাজ এগিয়ে নিতে এবং দ্রুত শেষ করতে দুটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২১ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হওয়ার পরই সেটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন জমির মালিক হায়দার আলী খান বহলুল, শওকত আলী খান বিপুলসহ অন্যরা।
অভিযোগ রয়েছে, ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সেখানে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় স্থাপন করা হয়। এজি প্রপার্টিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় হায়দার আলী খান, শওকত আলী খান বিপুলসহ পাঁচ ভূমিমালিক আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে ভবনে প্রবেশ করেন। এ সময় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়।
এজি প্রপার্টিজের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান ভবনটির নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের ঘটনায় হায়দার আলী খানের রাজনৈতিক প্রভাবের উৎস হিসেবে তাঁর শ্বশুর মনির চৌধুরীর নাম উঠে এসেছে। মনির চৌধুরী কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাদারীপুর জেলা শাখার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এবং মাদারীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।
জানা গেছে, মনির চৌধুরীর আপন চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ নূরে আলম লিটন চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এজি প্রপার্টিজের আমমোক্তারনামা বাতিল করানো হয়। এ কাজে মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আমিন সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এজি প্রপার্টিজের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হাবিবুল হাসানের দাবি, আমমোক্তারনামা বাতিলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। পরিস্থিতির চাপে প্রতিষ্ঠানটি এক কোটি ২৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, আমমোক্তারনামা বাতিলের পরও জমির মালিকপক্ষ এজি প্রপার্টিজের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি এজি প্রপার্টিজ। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, হায়দার আলী খানসহ পাঁচ ভূমিমালিক এখনো ভবনটির ওপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অংশে ভাড়া দেওয়া দোকান ও বাণিজ্যিক জায়গার ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকেও ভূমিমালিকপক্ষের লোকজন জোরপূর্বক ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে দোকানমালিক, ভাড়াটিয়া ও বাণিজ্যিক স্পেসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এ বিষয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “যখন আমি চুক্তিতে যাব, তখন চুক্তিতে যা লেখা আছে, তাই হবে। আপনি যত বড় মাপের মানুষ হয়ে থাকুন না কেন, চুক্তির বাইরে গিয়ে আপনি আমাকে বের করতে পারবেন না।”
তিনি মিরপুর সিটি সেন্টারের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও জানান।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বেআইনি বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “ভূমিমালিকদের এক ধরনের চিন্তা থাকে—আমার জমি, আমি যেকোনো সময় তুলে দেব! এটা ঠিক নয়। ডেভেলপাররা এখানে ব্যবসা করতে এসেছে।”
ভবন দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং আমমোক্তারনামা বাতিলের অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ করায় আর্থিক সংকটে পড়েছে এজি প্রপার্টিজ। একই সঙ্গে ভবনটিতে দোকান বা বাণিজ্যিক স্পেস কেনা ব্যক্তিরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং চলমান সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতা এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।




















