খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সুকুমার রায়ের বিরুদ্ধে চাকরিজীবনের আয়ের তুলনায় বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে তার নিজের, স্ত্রী, সন্তান ও বাবার নামে ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, জমি ও ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সুকুমার রায় খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক পদ থেকে ২০১৭ সালে অবসর নেন। তিনি সরকারের তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে চাকরির শেষ সময়ে বেতন-ভাতাসহ মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকা পেতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা ও অবসরকালীন পেনশন মিলিয়ে তার সর্বোচ্চ আয় প্রায় দুই কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অনুসন্ধানে তার নামে সোনালী ব্যাংকে প্রায় ৫১ কোটি টাকা আমানত এবং ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার টাকার সঞ্চয়পত্র থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রামদিয়া মৌজায় তার নামে ২২০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ জমি এবং ঢাকার পল্টন ও ফরিদপুর সদর এলাকায় ফ্ল্যাট থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের আয়ের উৎস সম্পর্কে তার আয়কর নথিতে পর্যাপ্ত তথ্য নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
সুকুমার রায় খাদ্য অধিদপ্তরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খোলাবাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয় বা ওএমএস কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন বলে খাদ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগের বরাত দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুকুমার রায়ের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার কাছে সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তী ফোনে আর সাড়া দেননি।
সুকুমার রায়ের স্ত্রী বনশ্রী বোস নিজেকে গৃহিণী হিসেবে পরিচয় দিলেও তার নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রে বিপুল অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকে তার নামে থাকা কয়েকটি হিসাবে মোট প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার আমানত থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি এফডিআরে যথাক্রমে ২ কোটি, ২ কোটি ৫০ লাখ, ১১ কোটি ও ১০ কোটি টাকা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া তার নামে প্রায় ৫৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ফরিদপুর সদরের শ্রীঅংগন দক্ষিণ পল্লী এলাকায় বাড়ি থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অর্থের উৎস হিসেবে বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া সম্পদ ও জমি বিক্রির অর্থ দেখানো হলেও বনশ্রী বোসের ট্যাক্স নথিতে এসব সম্পদের তথ্য নেই বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বনশ্রী বোস বলেন, এত টাকা তিনি কখনো দেখেননি। ব্যাংকের স্টেটমেন্ট দেখানোর কথা বলা হলে তিনি আর কথা বলতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুকুমার রায়ের বড় ছেলে সৌমেন রায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার মাসিক বেতন প্রায় ৪০ হাজার টাকা হলেও সোনালী ব্যাংকের হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে তার মায়ের আইএফআইসি ব্যাংক হিসাব থেকে সৌমেন রায়ের হিসাবে প্রায় ৪০ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুকুমার রায়ের বাবা শান্তিপদ রায় কৃষিকাজ করতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার নামে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রামদিয়া মৌজায় ৭৭ শতাংশ জমি থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। জমি কেনার অর্থের উৎস হিসেবে ছেলে সুকুমার রায়কে দাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সাবেক এই সরকারি কর্মকর্তা ও তার পরিবারের সম্পদের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক খোন্দকার ফরহাদ আহমেদ বলেন, সংবাদমাধ্যম দুদকের তথ্যের অন্যতম উৎস। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার কর নথিতে সম্পদের তথ্য গোপন করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সুকুমার রায় ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করছে।




















