রাজধানীর মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানজিলা জান্নাত রেটিনার বিরুদ্ধে সরকারি গেজেটভুক্ত ৭৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমি একটি মিসকেসের মাধ্যমে ব্যক্তির নামে রেকর্ড সংশোধনের আদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জমিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
এ ঘটনায় সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসের মাধ্যমে মোহাম্মদপুরের সেনপাড়া পর্বতা মৌজার সিটি খতিয়ান নম্বর ৫৩৫৯ এবং সিটি দাগ নম্বর ১৯১২৫ ও ১৯১৩০-এর ৭৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমির রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করা হয়। ওই জমি সরকার হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্টের নামে অধিগ্রহণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাকিস্তান আমলে মিরপুর এলাকায় হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৯০/৬৫-৫৬ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ৫/৭২-৭৩ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমেও কিছু জমি অধিগ্রহণ করা হয়।
বাউনিয়া, সেনপাড়া পর্বতা, চাকুলি ও দ্বিগুণ মৌজার বিভিন্ন জমি এসব অধিগ্রহণের আওতায় ছিল। ১৯৯০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরে ২০ সেপ্টেম্বর তা সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, অধিগ্রহণের পর হাউজিং প্রকল্পে ব্যবহৃত জমির বাইরে থাকা কিছু সরকারি সম্পত্তি বিভিন্ন সময়ে জাল দলিল, পর্চা, নামজারি ও খাজনার কাগজপত্রের মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানায় নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নুরুদ্দিন আহম্মেদের ওয়ারিশ দাবিদারদের পক্ষে মো. মোশারফ হোসেন ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসটি করেন। সেখানে ৭৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করা হয়।
মোশারফ হোসেনের পক্ষ থেকে ২৬৮৫ নম্বর দলিলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল সম্পাদিত একটি নোটারি নাদাবি ডিডের কথাও উল্লেখ করা হয়।
মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনা গত ৬ মে ওই মিসকেসের আদেশ দেন বলে নথির বরাত দিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আদেশের মধ্যেই জমিটি ৯০/৬৫-৬৬ ও ৫/৭২-৭৩ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমে হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্টের নামে অধিগ্রহণের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা সিটি জরিপে সংশ্লিষ্ট জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হওয়ার বিষয়টিও আদেশে উঠে এসেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত কোনো মিসকেসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সহকারী ভূমি কর্মকর্তা বা উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তার প্রতিবেদন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কানুনগো-সার্ভেয়ারের সরেজমিন তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেনপাড়া পর্বতা ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “উক্ত মিসকেসের উল্লিখিত জমি সরকারের অধিগ্রহণকৃত—এমন মতামত দেওয়ার পরও তা ব্যক্তির নামে রায় দেওয়া হয়েছে।”
মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেল ও সেনপাড়া পর্বতা তহশিল অফিস সূত্রে জানা গেছে, মিসকেসের আদেশ পাওয়ার পর মো. মোশারফের পক্ষ থেকে জমিটির নামজারির জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়।
তবে জমিটি সরকারি গেজেটভুক্ত হওয়ায় তহশিল পর্যায়ে ওই নামজারি অনুমোদন করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ নিয়ে মোহাম্মদপুর এসি ল্যান্ড কার্যালয় এবং সেনপাড়া পর্বতা তহশিল অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের অভিযোগ, সেনপাড়া পর্বতা ও মিরপুর এলাকার গেজেটভুক্ত সরকারি সম্পত্তি দখলের জন্য একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের জাল কাগজপত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, সরকারি জমি দখলের চেষ্টা ঠেকাতে ভূমি অফিসের নথি যাচাই ও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, অসাধু ব্যক্তি ও ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকলে সরকারি সম্পত্তি রক্ষার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাবেন বলে জানান। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর কাছ থেকে আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসে সরকারি গেজেটভুক্ত জমির রেকর্ড সংশোধনের আদেশ কীভাবে দেওয়া হলো এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি নথি ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।




















