মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত।
সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় সামনে আসছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া এই মুহূর্তে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম, বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বড় ধরনের চাপে পড়বে।
অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টনই ডিজেল।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার প্রায় ২০৫ টাকা। এর আগে দেশে ডিজেলের নির্ধারিত মূল্য ছিল ১১৫ টাকা প্রতি লিটার। ফলে তখন প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের প্রায় ৯০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল।
মূল্য সমন্বয়ের পরও সরকারকে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে দেশের বাজারমূল্যের পার্থক্য কমাতে মূল্য সমন্বয় করা হলেও সরকার এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি বহন করছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করা হলে শুধু ডিজেলে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাত।
তাঁর বক্তব্য, এ পরিমাণ অর্থ জ্বালানি খাতে ব্যয় করতে হলে সরকারের অন্যান্য উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে অর্থায়নে চাপ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারকে একদিকে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের আরেকটি কারণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে তেল পাচারের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন অনিন্দ ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রবাসীরা কষ্ট করে যে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা দেশের রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস। সেই বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি তেল যদি কম দামের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার হয়ে যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতির ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হবে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক কম থাকলে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে তেল পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর যে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে, সে বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার, জ্বালানি সরবরাহ এবং দেশের অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়েছে।
অনিন্দ ইসলাম অমিত আশা প্রকাশ করেন, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে জনগণ সরকারের জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তের বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম হবেন।
জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি কতদিন অস্থিতিশীল থাকবে এবং ভবিষ্যতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করা হবে কি না—তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।





















