ফাইল আটকে অর্থ আদায়, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার ও বিপুল সম্পদের অভিযোগ; জাহিদুলের দাবি—‘সব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দুই কর্মচারী ফাতেমা বেগম মলি ও জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, দাপ্তরিক কাজে প্রভাব বিস্তার, স্বজনপ্রীতি, সরকারি নথি নিয়ে অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সমর্থনে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও নথি দাখিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তবে অভিযোগগুলোর সবকটি আদালত বা তদন্তকারী কোনো কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলাম সবুজ অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। ফাতেমা বেগম মলির বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজউকের জোন-৫ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর প্রকল্প দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ফাতেমা বেগম মলি বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে উচ্চমান সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। অন্যদিকে এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাহিদুল ইসলাম সবুজ।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই ধরনের দাপ্তরিক দায়িত্বে থাকার সুযোগে তারা রাজউকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলন, ঠিকাদারি চুক্তি, বোর্ড সভার কার্যপত্র, ভবন নির্মাণের নকশা এবং ঠিকাদারদের বিল-সংক্রান্ত ফাইল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কোনো কোনো ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হতো। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ফাইল, নথি, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো স্বামীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার দাপ্তরিক দায়িত্বের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত।
অভিযোগকারীদের দাবি, তার স্বামী আবুল ফজল রাজুর মালিকানাধীন ‘রাজু ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রাজু প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপারস’ বিভিন্ন কাজ পেয়েছে। দরপত্রের আগে প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ এবং দরপত্রের শর্ত প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট দরপত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিধিবহির্ভূতভাবে কাজ দেওয়া হয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট ক্রয় নথি ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে রাজউকের এস্টেট ও ভূমি-২ শাখায় দাপ্তরিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্লট বরাদ্দ, ক্ষতিপূরণ, নামজারি ও মালিকানা পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন নথি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি একই প্লট একাধিক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ, নথি পরিবর্তন ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গায়েবের মতো গুরুতর অভিযোগও করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জাহিদুল ইসলাম সবুজ বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি বলেন, “আমি রাজউকে সততার সঙ্গে চাকরি করি। দাপ্তরিক কোনো কাজের বিনিময়ে আমি কারও কাছ থেকে কোনোদিন এক পয়সাও ঘুষ নিইনি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার সম্মানহানি করতে এবং আমাকে চাকরি থেকে সরানোর চক্রান্ত হিসেবে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ বিভিন্ন সংস্থায় ছড়াচ্ছে।”
ফাতেমা বেগম মলি ও জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে তাদের সরকারি চাকরির আয়ের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে ফাতেমা বেগম মলির নামে ধানমন্ডি ও ঝিগাতলায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একাধিক প্লট থাকার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি ও অন্যান্য সম্পদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে রাজধানীতে অ্যাপার্টমেন্ট, জমি ও নির্মাণাধীন ভবনে অংশীদারিত্ব এবং ব্যবসায়িক প্রকল্পে বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে এসব সম্পদের মূল্য কয়েক কোটি টাকা থেকে কয়েক দশ কোটি টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করা হলেও, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই অভিযোগে তার কথিত সম্পদ ও দাপ্তরিক অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া জাহিদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দাখিলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগের মধ্যে দাপ্তরিক হয়রানি, ঘুষ লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে এসব অভিযোগের পর তদন্তে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে বা কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে একটি হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার দাবিও করা হয়েছে। অভিযোগে মামলাটির নম্বর ও থানার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো মামলায় আসামি হওয়া নিজেই অপরাধ প্রমাণ করে না। মামলার অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
রাজউকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রাজউক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজউকের মতো রাজধানীর নগর উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ঘুষ, ফাইল আটকে রাখা, স্বজনপ্রীতি, দরপত্রে প্রভাব বিস্তার কিংবা সরকারি নথি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ বিবরণী, ভূমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেন, দরপত্রের নথি, ফাইলের গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা যেতে পারে।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন ও সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও যেন ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে অন্যায় ক্ষতি না হয়—সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।




















