মানুষের জীবন বাঁচাতে আগুন, ধোঁয়া ও নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে প্রবেশ করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত তাপ-প্রতিরোধী বুট, সুরক্ষা গ্লাভস, মাস্ক, পোশাক, চোখের সুরক্ষা সামগ্রীসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের মান তাই শুধু ক্রয়-সংক্রান্ত বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে উদ্ধারকর্মীদের জীবন ও কর্মনিরাপত্তা।
কিন্তু এসব জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম কেনা, সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ক্রয় ও স্টোর শাখার বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) মো. হেলাল উদ্দিন খাঁন এবং শামস আরমান। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে তাঁদের ঘিরে দরপত্র, ক্রয়, সরবরাহ, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত বলা যায় না। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, সরবরাহ চুক্তি, পণ্যের মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, বিল-ভাউচার, গুদাম রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বসংক্রান্ত আদেশ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ক্রয় ও স্টোর শাখাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ হলো—দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট সরবরাহকারী বা ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য সমঝোতা করা হতো।
অভিযোগকারীদের দাবি, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, মূল্যায়ন এবং পণ্য গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের বিনিময়ে সরবরাহকারী নির্বাচন এবং সরবরাহকৃত পণ্য গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।
একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ক্রয় ও গুদামসংক্রান্ত কাজে ৩ থেকে ৫ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পোশাক ও বুট কেনাকাটায় ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সময়ের সব দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকা, দরপত্রের শর্ত, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ এবং চূড়ান্ত সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তির তুলনামূলক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ফায়ার ফাইটারদের জন্য কেনা তাপ-প্রতিরোধী বুট, সুরক্ষা গ্লাভস, মাস্ক, পোশাক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের মান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য না থাকা কিছু পণ্যও গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে আগুনের তাপ, ধোঁয়া এবং বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে ব্যবহৃত সরঞ্জামের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান থেকে সামান্য বিচ্যুতিও কর্মীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ কারণে পণ্য কেনার সময় অনুমোদিত নমুনা, টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন, পরীক্ষাগারের মান পরীক্ষার রিপোর্ট, পরিদর্শন কমিটির প্রতিবেদন এবং বাস্তবে সরবরাহ করা পণ্যের নমুনা পাশাপাশি পরীক্ষা করা জরুরি।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন সরঞ্জাম নিম্নমানের হওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। সেখানে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে ক্রয়-সংক্রান্ত নথি ও সরবরাহকৃত পণ্যের মান পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
ক্রয়-পরবর্তী ধাপেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকারি অর্থে কেনা সরঞ্জাম গুদামে কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, কত পরিমাণ মালামাল গ্রহণ করা হয়েছে, স্টক রেজিস্টারে কতটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কোন ইউনিটে কতটি সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই না করলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টোরকিপার বাহাউদ্দিনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার বাইরে গুদাম পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়েও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।
তদন্তের ক্ষেত্রে স্টক রেজিস্টার, ইস্যু রেজিস্টার, গুদামে মালামাল গ্রহণের চালান, দায়িত্ব হস্তান্তরের নথি এবং বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনে সরবরাহের রেকর্ড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ক্রয় ও গুদাম শাখার কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে শামস আরমানকে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতি মাসে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় উপহার ও বাজারসামগ্রীও পৌঁছে দেওয়া হতো।
সদরঘাটের বাসায় ব্যাগভর্তি বাজার পৌঁছে দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে।
তবে এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেনের নথি, সরবরাহকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
শামস আরমানের পদায়ন ও দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে ময়মনসিংহে উপসহকারী পরিচালক হিসেবে বদলি করা হলেও ঢাকায় অধিদপ্তরের স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বদলি আদেশ, যোগদানপত্র, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং পরবর্তী সময়ে জারি করা অফিস আদেশ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মো. হেলাল উদ্দিন খাঁনকে ঘিরে বদলি, নিয়োগ, প্রশাসন, ক্রয় ও স্টোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগেও অভিযোগ ওঠার কথা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালের বিভিন্ন পদায়ন ও দায়িত্ব পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বরিশালে দায়িত্ব পালনের সময় পরিদর্শকদের কাছ থেকে লাইসেন্সপ্রতি মাসিক অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ওই সময়ের দায়িত্বসংক্রান্ত নথি, লাইসেন্স প্রক্রিয়ার রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
বর্তমানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকায় মো. হেলাল উদ্দিন খাঁনকে সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উত্থাপিত অভিযোগগুলো আলাদা আলাদা হলেও এগুলোর একটি সাধারণ যোগসূত্র রয়েছে—দরপত্র থেকে সরবরাহ এবং সরবরাহ থেকে গুদাম ও মাঠপর্যায়ে বিতরণ পর্যন্ত পুরো ক্রয়-সরবরাহ ব্যবস্থাপনা।
একটি সম্ভাব্য অনিয়ম যাচাই করতে হলে তাই শুধু একটি বিল বা একটি দরপত্র পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। বরং একই সরবরাহকারীর সঙ্গে একাধিক চুক্তি, বাজারমূল্যের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের পার্থক্য, অনুমোদিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে সরবরাহকৃত পণ্যের মিল, পণ্য গ্রহণের সময় মান পরীক্ষা এবং গুদাম থেকে বিতরণের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মান নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব অন্য অনেক সরকারি ক্রয়ের তুলনায় আরও বেশি। কারণ এসব সরঞ্জামের একটি বড় অংশ সরাসরি দুর্ঘটনাস্থলে কর্মরত সদস্যদের সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়।
ফলে অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণে একটি স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্তের আওতায় দরপত্রের শর্ত, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, সরবরাহকৃত পণ্যের স্পেসিফিকেশন, মান পরীক্ষার রিপোর্ট, বিল-ভাউচার, গুদাম রেজিস্টার, সরবরাহ ও বিতরণ রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বের আদেশ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়েও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে, বিষয়টি শুধু সরকারি অর্থ ব্যয়ের সম্ভাব্য অনিয়মের প্রশ্ন নয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ফায়ার ফাইটারদের জীবন রক্ষার জন্য কেনা সরঞ্জাম সত্যিই নির্ধারিত মানের কি না এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে কি না।





















