রাজধানীর দারুস সালাম থানার মিরপুর হাউজিংয়ের পাইকপাড়া এলাকার ২০ দশমিক ৮৩৩২৫ কাঠা জমি বিক্রিতে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় দলিলে কম মূল্য দেখানো, জাল কাগজপত্র তৈরি, কোম্পানির সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে।
চকবাজার থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো তদন্ত প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ ও অনুসন্ধানের ফল; আদালতে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরপুর হাউজিংয়ের পাইকপাড়া এলাকার প্লট নম্বর ২/বি-এর ২০ দশমিক ৮৩৩২৫ কাঠা জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ছিল ৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট সম্পাদিত সাফ কবলায় জমিটির মূল্য দেখানো হয় ১৭ কোটি টাকা।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃত মূল্য ও দলিলে উল্লেখ করা মূল্যের পার্থক্য ৪৬ কোটি টাকা। এই অর্থ নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করেছে সিআইডি।
তদন্ত সংস্থার দাবি, প্রকৃত লেনদেনের চেয়ে কম মূল্য দলিলে দেখানোর মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন দলিলে জমির মূল্যে বড় পার্থক্য
সিআইডির তদন্তে একই জমির বিভিন্ন সময়ের দলিলে ভিন্ন ভিন্ন মূল্য দেখানোর বিষয়টিও উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী—
২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারির দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয় ৪০ কোটি টাকা।
২০১৮ সালের ৮ মার্চের দলিলে মূল্য দেখানো হয় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
২০১৮ সালের ১৬ আগস্টের দলিলে মূল্য দেখানো হয় ১৭ কোটি টাকা।
২০২১ সালের ৩০ মে’র দলিলে একই জমির মূল্য দেখানো হয় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
সিআইডি বলেছে, সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিধিমালা পর্যালোচনা করেও তারা দলিলে প্রকৃত লেনদেনের তুলনায় কম মূল্য দেখানোর বিষয়টি পেয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু জমি বিক্রির দলিল নয়, কোম্পানির শেয়ার সংক্রান্ত নথিতেও অনিয়মের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ১১ লাখ ১০ হাজারে উন্নীত করার পর মৃত শেয়ারহোল্ডারদের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য শেয়ার দেওয়া হয়নি। বরং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে ৫৪ হাজার ৫৩৬টি শেয়ার ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ জেরিন আহমেদ ও মো. ফাহমিদের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কোম্পানির গঠনতন্ত্র, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি এবং অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সিআইডি।
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্পত্তি বিক্রির অনুমোদন দেখাতে কোম্পানির ২০ জনের মধ্যে ১৫ জনের স্বাক্ষর জাল করে একটি বোর্ড রেজল্যুশন তৈরি করা হয়।
ওই রেজল্যুশনের ভিত্তিতেই সম্পত্তি বিক্রি ও ক্রয়ের অনুমোদন নেওয়া হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্রও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা।
পরে ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট ৬৯৮৫ নম্বর সাফ কবলার মাধ্যমে সম্পত্তিটি হস্তান্তর করা হয়।
সিআইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল জাল হলফনামা এবং ভুয়া ও জাল অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হয়।
এসব নথি ব্যবহার করে ২০১৮ সালের ২৮ জুন কোম্পানিটি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত সংস্থার দাবি, এ সময় মামলার বাদী কানিজ ফাতেমা অনুপস্থিত থাকলেও তার স্বাক্ষর জাল করা হয়। একইভাবে কোম্পানির আটজন শেয়ারহোল্ডার ও মামলার সাক্ষীদের স্বাক্ষর জাল করার প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে ছয় আসামির বিরুদ্ধে পারস্পরিক যোগসাজশে কোম্পানির নগদ অর্থ ও সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আসামিরা হলেন—আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের চার পরিচালক সুফিয়া বেগম, জেরিন আহমেদ, মো. ফাহমিদ ও মো. মারুফ আহম্মদ; ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলাম এবং প্যানসিয়া সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রফেসর চৌধুরী মাহমুদ হাসান।
ঘটনাটি নিয়ে গত বছর চকবাজার থানায় সিআর মামলা নম্বর ৪৭৩/২০২৫ দায়ের করা হয়। মামলাটির তদন্ত করেন সিআইডি ঢাকা মেট্রো-দক্ষিণের পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী।
তদন্তের সময় তিনি লিখিত চুক্তি, কোম্পানির গঠনতন্ত্র, শেয়ার সংক্রান্ত নথি, সাফ কবলা, হলফনামা, অডিট রিপোর্ট, কোম্পানি বন্ধের নথি, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল পর্যালোচনা করেন।
তদন্ত শেষে চলতি বছরের ২৯ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩১-এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
গত ৩ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩১-এ সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে শুনানি হয়। আদালত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী আদেশ দেওয়ার কথা জানায়।
পরে আরও শুনানির জন্য ২ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হলেও মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. একরামুল হক মজুমদার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় ওই দিন মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
মামলাটি বর্তমানে বিচারিক কার্যক্রমের পর্যায়ে রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালের এমডি অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পরে হোয়াটসঅ্যাপে মামলার নম্বর ও অভিযোগের বিষয়বস্তু উল্লেখ করে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পত্তি হস্তান্তর, শেয়ার অন্তর্ভুক্তি এবং কোম্পানির নথিপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় একাধিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে।





















