পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ব্যবস্থাপনায় অসংগতি, শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, এমপিও-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সারওয়াত খানমসহ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত বিভিন্ন ব্যাংকে থাকার পরও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই কিছু এফডিআর ভাঙিয়ে অর্থ সাধারণ হিসাবে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এফডিআর হিসেবে জমা ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব এফডিআর থেকে প্রায় ৯৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা মুনাফা পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ অর্থ ব্যবস্থাপনা ও এফডিআর ভাঙার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির এডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে ১৫ জন এডহক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগে আগের তুলনায় বেশি বেতন নির্ধারণ এবং নিয়োগের নামে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সময়ে কলেজ শাখায় শিক্ষার্থী সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও একাধিক এডহক শিক্ষক নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সময় কোচিং ও মডেল টেস্টের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। তাঁদের দাবি, ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ৩ হাজার টাকা এবং ২০২৬ সালে প্রায় ৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
অভিযোগকারীরা আরও জানান, ২০২৬ সালে কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ও পুরোনো শিক্ষার্থীদের সেশন চার্জও বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের মোট তহবিল ছিল প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। পরবর্তী অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ নিয়েও তাঁরা স্বচ্ছতা ও যথাযথ হিসাব যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, ২০২৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে কাজটি এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শ্রেণিকক্ষের সংকট থাকা সত্ত্বেও ভবন নির্মাণের সুযোগটি কাজে লাগানো হয়নি। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের নথিপত্র পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষকের নিয়োগ ও এমপিও নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে প্রভাষক মোহাম্মদ আব্দুল আলীমের নাম ও এমপিও-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁর নিয়োগ, এমপিও সূচক, বেতন স্কেল ও শিক্ষক নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য তদন্তের দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, প্রতিষ্ঠানের সাবেক অধ্যক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আল-আমিনের এমপিও ও পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে তিনি এমপিও ও পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আল-আমিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের এফডিআর, ব্যাংক হিসাব, অডিট রিপোর্ট, শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও নথি, বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা ফি এবং ভবন নির্মাণসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সারওয়াত খানমের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতাও তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।




















