০৪:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একনেকের শর্ত শেষ হওয়ার আগেই ১,৪৯২ কোটি টাকার প্রকল্পে পিডি নিয়োগ, মামুন বিশ্বাসকে ঘিরে প্রশ্ন

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৩:৩৩:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৭

১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ‘বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন’ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে ঠাকুরগাঁও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের সরকারি আদেশ (জিও) জারির আগেই তাঁকে পূর্ণকালীন পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে একনেকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজও চলছিল।

এর পাশাপাশি প্রকল্পটির প্রস্তাব প্রণয়ন ও সাজানোর সঙ্গে মামুন বিশ্বাসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় একই ব্যক্তির প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়া নিয়েও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নথিপত্রের সময়ক্রম অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২২ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে এলজিইডি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকে আসবে।

একনেকের অনুমোদনের সময় প্রকল্পটির ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাস্তবায়নকাল সংশোধনের পাশাপাশি পরামর্শক, গাড়ি ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণসহ কয়েকটি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

এরপর ৪ আগস্ট পরিকল্পনা বিভাগের এনইসি-একনেক ও সমন্বয় অনুবিভাগ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দিয়ে একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু এর মাত্র আট দিনের মাথায়, ১২ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে পিডি নিয়োগের বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১৩ আগস্ট মামুন বিশ্বাসকে প্রকল্পটির পূর্ণকালীন পিডি হিসেবে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

অর্থাৎ ২২ জুলাই প্রকল্প অনুমোদন, ৪ আগস্ট ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ, ১২ আগস্ট পিডি নিয়োগের সভা এবং ১৩ আগস্ট নিয়োগের প্রজ্ঞাপন—সবকিছুই হয়েছে মাত্র ২২ দিনের মধ্যে।

লোচনায় জানা গেছে, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের জিও জারি হয়নি। অথচ তার আগেই পিডি হিসেবে মামুন বিশ্বা
নথিপত্র পর্যা
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর একনেক উইং ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক আদেশ জারির পর পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সের নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
তাঁর মতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প তৈরির সময় থেকেই সম্ভাব্য পিডিকে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাখা হতে পারে। এতে প্রকল্প সম্পর্কে তাঁর ধারণা তৈরি হয়। তবে একই ব্যক্তি আগে থেকেই প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নে যুক্ত থাকলে পরবর্তী সময়ে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রচলিত নির্দেশনা অনুযায়ী একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রশাসনিক আদেশ বা জিও জারি হয় এবং এরপর পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। ফলে জিও জারির আগেই পিডি নিয়োগ হয়ে থাকলে সেটি প্রচলিত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই প্রয়োজন।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতারও জানিয়েছেন, বর্তমান পরিপত্রে জিও জারির আগে পিডি নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুতে বিলম্ব হওয়ায় পরিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ হলো, তিনি বৃহত্তর দিনাজপুর প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি ও সাজানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তাকেই প্রকল্পটির পূর্ণকালীন পিডি করা হয়েছে।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্প প্রণয়নের সময় তাঁর দায়িত্ব কী ছিল, ডিপিপি তৈরিতে তাঁর ভূমিকা কতটা ছিল এবং পিডি নিয়োগের সুপারিশের সভার কার্যবিবরণীতে কী যুক্তি দেখানো হয়েছে—এসব নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কারণ ডিপিপিতে প্রকল্পের কাজের পরিধি, ব্যয়ের খাত, বাস্তবায়ন কৌশল, পরামর্শক নিয়োগ, গাড়ি ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে একই কর্মকর্তা এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

নতুন প্রকল্পে নিয়োগের পাশাপাশি মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আগের বিভিন্ন অভিযোগও সামনে এসেছে।

ঠাকুরগাঁও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ প্রকাশিত হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন এবং ব্যক্তিগত কাজে নিয়মিত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। সরকারি গাড়ির জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাবও তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত বিমানযোগে ঢাকা যাতায়াত এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অন্য দপ্তরের গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঠিকাদারদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, কাজ শেষ হওয়ার পর ফাইলে স্বাক্ষর পেতে তাঁদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হতো। ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামুন বিশ্বাস সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একসময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকৌশলীদের একটি সংগঠনের কার্যক্রমে তাঁর অংশগ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

‘বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা সমন্বিত উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার যোগাযোগ ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পে ২১ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ১৭১ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৮৪২ দশমিক ৫২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি ১৬টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এত বড় সরকারি প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরপত্র, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি কাজ, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব রয়েছে।

তাই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের দাবি উঠেছে।

মামুনের বক্তব্য কী?

অভিযোগের বিষয়ে মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বলে জানান। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি কমানো কঠিন।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন কয়েকটি—প্রশাসনিক জিও জারির আগেই কেন পিডি নিয়োগ দেওয়া হলো, ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ চলাকালীন নিয়োগের ভিত্তি কী ছিল, মামুন বিশ্বাস প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন কি না এবং তাঁর বিরুদ্ধে আগের অভিযোগগুলোর কোনো তদন্ত হয়েছে কি না।

১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব প্রশ্নের প্রামাণ্য উত্তর পাওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বাধিক পঠিত

জনগণকেন্দ্রিক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক চান দুই দেশের স্পিকার-হাইকমিশনার

একনেকের শর্ত শেষ হওয়ার আগেই ১,৪৯২ কোটি টাকার প্রকল্পে পিডি নিয়োগ, মামুন বিশ্বাসকে ঘিরে প্রশ্ন

আপডেট: ০৩:৩৩:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ‘বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন’ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে ঠাকুরগাঁও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের সরকারি আদেশ (জিও) জারির আগেই তাঁকে পূর্ণকালীন পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে একনেকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজও চলছিল।

এর পাশাপাশি প্রকল্পটির প্রস্তাব প্রণয়ন ও সাজানোর সঙ্গে মামুন বিশ্বাসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় একই ব্যক্তির প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়া নিয়েও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নথিপত্রের সময়ক্রম অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২২ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে এলজিইডি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকে আসবে।

একনেকের অনুমোদনের সময় প্রকল্পটির ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাস্তবায়নকাল সংশোধনের পাশাপাশি পরামর্শক, গাড়ি ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণসহ কয়েকটি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

এরপর ৪ আগস্ট পরিকল্পনা বিভাগের এনইসি-একনেক ও সমন্বয় অনুবিভাগ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দিয়ে একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু এর মাত্র আট দিনের মাথায়, ১২ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে পিডি নিয়োগের বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১৩ আগস্ট মামুন বিশ্বাসকে প্রকল্পটির পূর্ণকালীন পিডি হিসেবে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

অর্থাৎ ২২ জুলাই প্রকল্প অনুমোদন, ৪ আগস্ট ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ, ১২ আগস্ট পিডি নিয়োগের সভা এবং ১৩ আগস্ট নিয়োগের প্রজ্ঞাপন—সবকিছুই হয়েছে মাত্র ২২ দিনের মধ্যে।

লোচনায় জানা গেছে, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের জিও জারি হয়নি। অথচ তার আগেই পিডি হিসেবে মামুন বিশ্বা
নথিপত্র পর্যা
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর একনেক উইং ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক আদেশ জারির পর পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সের নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
তাঁর মতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প তৈরির সময় থেকেই সম্ভাব্য পিডিকে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাখা হতে পারে। এতে প্রকল্প সম্পর্কে তাঁর ধারণা তৈরি হয়। তবে একই ব্যক্তি আগে থেকেই প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নে যুক্ত থাকলে পরবর্তী সময়ে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রচলিত নির্দেশনা অনুযায়ী একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রশাসনিক আদেশ বা জিও জারি হয় এবং এরপর পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। ফলে জিও জারির আগেই পিডি নিয়োগ হয়ে থাকলে সেটি প্রচলিত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই প্রয়োজন।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতারও জানিয়েছেন, বর্তমান পরিপত্রে জিও জারির আগে পিডি নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুতে বিলম্ব হওয়ায় পরিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ হলো, তিনি বৃহত্তর দিনাজপুর প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি ও সাজানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তাকেই প্রকল্পটির পূর্ণকালীন পিডি করা হয়েছে।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্প প্রণয়নের সময় তাঁর দায়িত্ব কী ছিল, ডিপিপি তৈরিতে তাঁর ভূমিকা কতটা ছিল এবং পিডি নিয়োগের সুপারিশের সভার কার্যবিবরণীতে কী যুক্তি দেখানো হয়েছে—এসব নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কারণ ডিপিপিতে প্রকল্পের কাজের পরিধি, ব্যয়ের খাত, বাস্তবায়ন কৌশল, পরামর্শক নিয়োগ, গাড়ি ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে একই কর্মকর্তা এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

নতুন প্রকল্পে নিয়োগের পাশাপাশি মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আগের বিভিন্ন অভিযোগও সামনে এসেছে।

ঠাকুরগাঁও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ প্রকাশিত হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন এবং ব্যক্তিগত কাজে নিয়মিত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। সরকারি গাড়ির জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাবও তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত বিমানযোগে ঢাকা যাতায়াত এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অন্য দপ্তরের গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঠিকাদারদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, কাজ শেষ হওয়ার পর ফাইলে স্বাক্ষর পেতে তাঁদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হতো। ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামুন বিশ্বাস সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একসময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকৌশলীদের একটি সংগঠনের কার্যক্রমে তাঁর অংশগ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

‘বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা সমন্বিত উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার যোগাযোগ ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পে ২১ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ১৭১ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৮৪২ দশমিক ৫২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি ১৬টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এত বড় সরকারি প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরপত্র, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি কাজ, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব রয়েছে।

তাই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের দাবি উঠেছে।

মামুনের বক্তব্য কী?

অভিযোগের বিষয়ে মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বলে জানান। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি কমানো কঠিন।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন কয়েকটি—প্রশাসনিক জিও জারির আগেই কেন পিডি নিয়োগ দেওয়া হলো, ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ চলাকালীন নিয়োগের ভিত্তি কী ছিল, মামুন বিশ্বাস প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন কি না এবং তাঁর বিরুদ্ধে আগের অভিযোগগুলোর কোনো তদন্ত হয়েছে কি না।

১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব প্রশ্নের প্রামাণ্য উত্তর পাওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।