১২:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

সমাজসেবা অধিদপ্তরে প্রায় পৌনে ৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ কামরুল হাসান ফিরাদিল এর বিরুদ্ধে

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১১:২৪:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৮

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় ও কেনাকাটায় বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (গুদাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন) মো. কামরুল হাসান সরকার এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. ফিরাদুল হক।

দাপ্তরিক নথি ও কেনাকাটার হিসাব বিশ্লেষণের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিধি না মেনে কাজ খণ্ডিত করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া এবং ভাউচার ও বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী RFQ পদ্ধতিতে বাৎসরিক ক্রয়ের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন নথিতে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত সীমার তুলনায় এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা।

আরও অভিযোগ রয়েছে, একই ধরনের কাজ বারবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে RFQ পদ্ধতিতে কয়েকটি পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিউ বাকেরগঞ্জ ডেকোরেটর, ক্যাপিটাল ইলেকট্রিক, আরজে কনস্ট্রাকশন, সেলভিশন সিস্টেমস ও আফরিন এন্টারপ্রাইজ-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে সরাসরি ভাউচার বা নগদ কেনাকাটার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া হিসাবের বরাতে বলা হয়েছে, ভাউচারের মাধ্যমে ২ কোটি ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের হিসাবে, নির্ধারিত সীমার তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

কম্পিউটার সামগ্রী, সেমিনারের ব্যাগ, আপ্যায়ন, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী ও যানবাহন মেরামতের মতো বিভিন্ন খাতে শত শত ভাউচারের মাধ্যমে এসব অর্থ ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া গত অর্থবছরের RFQ খাতের আরও ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই বিলগুলো দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় আটকে যাওয়ার পর পরবর্তী অর্থবছরে পুনরায় পাস করিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। তার দাবি, গত অর্থবছরে RFQ খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ ছিল, সেই পরিমাণই ব্যয় করা হয়েছে। স্থগিত থাকা ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল প্রসঙ্গে তিনি জানান, হিসাবরক্ষণ অফিসের আপত্তির কারণে নয়, বরং বরাদ্দ সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলো বকেয়া দায় হিসেবে পরবর্তী বছরের বাজেট থেকে সরকারি নিয়ম ও জিএফআর অনুসরণ করে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

RFQ খাতে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ের বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, পিপিআর-২০০৫ অনুযায়ী RFQ সীমার মধ্যে থেকে আলাদা অর্থনৈতিক খাতে বিভিন্ন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে RFQ কমিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র বা OTM পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নগদ ও সরাসরি ক্রয়ের বিষয়ে মহাপরিচালক দাবি করেন, ভাউচার বা নগদ ক্রয়ের সীমা ২৫ লাখ টাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী Direct Contracting Method (DCM) প্রযোজ্য। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সব ধরনের ক্রয় e-GP পদ্ধতিতে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কাজ খণ্ডিত করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন মহাপরিচালক। তিনি জানান, অহেতুক প্যাকেজ বিভাজন এড়াতে ছয়টি কাজ OTM পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরে RFQ পদ্ধতিতে নতুন কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী পরিচালক মো. কামরুল হাসান সরকার দাবি করেন, তিনি গত অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে বর্তমান দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, দাপ্তরিক নথিতে তার সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

অন্যদিকে সহকারী পরিচালক মো. ফিরাদুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তাকে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী, RFQ খাতে অতিরিক্ত ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা, সরাসরি ভাউচারে অতিরিক্ত ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং আগের অর্থবছরের ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল—এই তিন খাত মিলিয়ে মোট ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সর্বাধিক পঠিত

জামায়াত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল’: রাশেদ খাঁন

সমাজসেবা অধিদপ্তরে প্রায় পৌনে ৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ কামরুল হাসান ফিরাদিল এর বিরুদ্ধে

আপডেট: ১১:২৪:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় ও কেনাকাটায় বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (গুদাম, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন) মো. কামরুল হাসান সরকার এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. ফিরাদুল হক।

দাপ্তরিক নথি ও কেনাকাটার হিসাব বিশ্লেষণের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিধি না মেনে কাজ খণ্ডিত করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া এবং ভাউচার ও বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী RFQ পদ্ধতিতে বাৎসরিক ক্রয়ের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন নথিতে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত সীমার তুলনায় এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা।

আরও অভিযোগ রয়েছে, একই ধরনের কাজ বারবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে RFQ পদ্ধতিতে কয়েকটি পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিউ বাকেরগঞ্জ ডেকোরেটর, ক্যাপিটাল ইলেকট্রিক, আরজে কনস্ট্রাকশন, সেলভিশন সিস্টেমস ও আফরিন এন্টারপ্রাইজ-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে সরাসরি ভাউচার বা নগদ কেনাকাটার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া হিসাবের বরাতে বলা হয়েছে, ভাউচারের মাধ্যমে ২ কোটি ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের হিসাবে, নির্ধারিত সীমার তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

কম্পিউটার সামগ্রী, সেমিনারের ব্যাগ, আপ্যায়ন, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী ও যানবাহন মেরামতের মতো বিভিন্ন খাতে শত শত ভাউচারের মাধ্যমে এসব অর্থ ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া গত অর্থবছরের RFQ খাতের আরও ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই বিলগুলো দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় আটকে যাওয়ার পর পরবর্তী অর্থবছরে পুনরায় পাস করিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। তার দাবি, গত অর্থবছরে RFQ খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ ছিল, সেই পরিমাণই ব্যয় করা হয়েছে। স্থগিত থাকা ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল প্রসঙ্গে তিনি জানান, হিসাবরক্ষণ অফিসের আপত্তির কারণে নয়, বরং বরাদ্দ সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলো বকেয়া দায় হিসেবে পরবর্তী বছরের বাজেট থেকে সরকারি নিয়ম ও জিএফআর অনুসরণ করে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

RFQ খাতে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ের বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, পিপিআর-২০০৫ অনুযায়ী RFQ সীমার মধ্যে থেকে আলাদা অর্থনৈতিক খাতে বিভিন্ন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে RFQ কমিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র বা OTM পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নগদ ও সরাসরি ক্রয়ের বিষয়ে মহাপরিচালক দাবি করেন, ভাউচার বা নগদ ক্রয়ের সীমা ২৫ লাখ টাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী Direct Contracting Method (DCM) প্রযোজ্য। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সব ধরনের ক্রয় e-GP পদ্ধতিতে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কাজ খণ্ডিত করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন মহাপরিচালক। তিনি জানান, অহেতুক প্যাকেজ বিভাজন এড়াতে ছয়টি কাজ OTM পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরে RFQ পদ্ধতিতে নতুন কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী পরিচালক মো. কামরুল হাসান সরকার দাবি করেন, তিনি গত অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে বর্তমান দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, দাপ্তরিক নথিতে তার সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

অন্যদিকে সহকারী পরিচালক মো. ফিরাদুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তাকে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী, RFQ খাতে অতিরিক্ত ৩ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা, সরাসরি ভাউচারে অতিরিক্ত ২ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং আগের অর্থবছরের ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল—এই তিন খাত মিলিয়ে মোট ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।